আলমডাঙ্গা ব্যুরো ॥ ইতিহাস কখনো কখনো নীরবেই লেখা হয়। আর সেই ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়ের সাক্ষী এখন চুয়াডাঙ্গা। জেলার প্রশাসনিক নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, যেখানে দায়িত্ব, দক্ষতা, মানবিকতা ও সেবার অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে এসেছেন নারীরা। চুয়াডাঙ্গার দ্বিতীয় নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন লুৎফুন নাহার। তাঁর নেতৃত্বে জেলার চার উপজেলার মধ্যে তিনটিতে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দায়িত্ব পালন করছেন। ইতোমধ্যে জীবননগর উপজেলায়ও নারী ইউএনও পদায়ন হওয়ায় প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসকসহ চার উপজেলার ইউএনও পদে একযোগে পাঁচ নারী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের ঐতিহাসিক নজির সৃষ্টি হয়েছে।এটি শুধু প্রশাসনিক বদল নয়; এটি নারীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিন ধরে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়া নারীরা এখন মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়েও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছেন। চুয়াডাঙ্গার ইতিহাসে এর আগে ২০১৫ সালের ২৫ জুন জেলার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সায়মা ইউনুস। তিনি ২০১৭ সালের ১১ মার্চ পর্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর প্রায় এক দশক পর আবারও নারী নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন ঘটে লুৎফুন নাহারের হাত ধরে। গত ২৯ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব লুৎফুন নাহারকে চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২ এপ্রিল ২০২৬ তিনি জেলার ৩০তম জেলা প্রশাসক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিসিএস ২৭তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জনবান্ধব ও গতিশীল প্রশাসন গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।একই দিনে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব নেন তিথি মিত্র। পরে ১১ মে আলমডাঙ্গা উপজেলার ইউএনও হিসেবে যোগ দেন বিসিএস ৩৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার, যিনি এর আগে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর গত ২৪ জুন খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের প্রজ্ঞাপনে লাভলী ইয়াসমিনকে দামুড়হুদা এবং সুমাইয়া সুলতানা এ্যানিকে জীবননগর উপজেলার ইউএনও হিসেবে পদায়ন করা হয়। ২৮ জুন বিকেলে লাভলী ইয়াসমিন আনুষ্ঠানিকভাবে দামুড়হুদা উপজেলার ইউএনও ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, জীবননগরে পদায়ন পাওয়া সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি এখনো দায়িত্ব গ্রহণ না করলেও তাঁর পদায়নের মধ্য দিয়েই চুয়াডাঙ্গার প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে।জেলার সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের এই সম্মিলিত নেতৃত্ব শুধু প্রতীকী অর্জন নয়; এটি জনসেবার মানোন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের জন্য ভালো কাজ করছে—এটি তারই প্রমাণ। এই জেলায় আরও দুজন নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, এটি খুবই ইতিবাচক বিষয়। আমি ছেলে ইউএনওদের সঙ্গেও কাজ করেছি, তারাও ভালো কাজ করেন। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, মেয়েরা আরও বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তারা যেমন সংসার সামলান, তেমনি কর্মক্ষেত্রও নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পরিচালনা করেন।”তিনি আরও বলেন, “দেশের উন্নয়নে নারীদের এই অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন এবং ভবিষ্যতেও রাখবেন। চুয়াডাঙ্গার সার্বিক উন্নয়নে আমি সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। চুয়াডাঙ্গার এই অনন্য দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে—নেতৃত্বের মাপকাঠি লিঙ্গ নয়, বরং যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও মানবিকতা। নারী নেতৃত্বের এই অগ্রযাত্রা শুধু প্রশাসনের নতুন ইতিহাসই নয়, বরং আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন দেখার সাহসও বাড়িয়ে দেবে। আজকের এই অর্জন ভবিষ্যতের আরও অসংখ্য নারীকে নেতৃত্বের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।


