নাজমুল হুসাইন, ইবি প্রতিনিধি ॥ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন শাপলা ফোরাম ও বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন জিয়া পরিষদের ভোটার তালিকায় একই শিক্ষকের নাম পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজগর হোসেনের নাম দুই সংগঠনের পৃথক নির্বাচনী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় শিক্ষক রাজনীতিতে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর শিক্ষক নেতারা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিলেও, বিপরীত রাজনৈতিক আদর্শের দুই সংগঠনের সদস্যপদ একই সঙ্গে বহাল থাকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রাপ্ত নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত শাপলা ফোরামের কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচনের ভোটার তালিকায় ১৩১ নম্বরে ড. মোহাম্মদ আজগর হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে গতকাল ১৫ জুন প্রকাশিত জিয়া পরিষদের ২০২৬ সালের কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচনের খসড়া ভোটার তালিকার ২৩ নং ভোটার হিসেবেও তার নাম রয়েছে।
শিক্ষক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিপরীত রাজনৈতিক আদর্শের দুটি সংগঠনের সদস্য হিসেবে একই ব্যক্তির নাম থাকা সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক নীতিমালা ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক মহলে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন শাপলা ফোরামের ২০২৩ সালের নির্বাচনের নির্বাচন কমিশনার সদস্য অধ্যাপক ড. দেবাশীষ শর্মা বলেন, ‘তার নাম যেহেতু ভোটার তালিকায় আছে, সেহেতু তিনি অবশ্যই শাপলা ফোরামের সদস্য ছিলেন। তালিকা প্রকাশের পর তিনি কোনো আপত্তিও জানাননি। তাই তিনি সংগঠনের সদস্য ছিলেন, এ বিষয়ে সন্দেহের সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বেশিরভাগ সময়ই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থাকেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, তিনি কিছুটা সুবিধাবাদী চরিত্রের। যখন যে পক্ষ ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের কাছাকাছি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।’ অন্যদিকে জিয়া পরিষদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. আ.খ.ম. ওয়ালী উল্লাহ বলেন, ‘আমরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে সদস্যদের তালিকা নিয়েছি। তারা যে তালিকা দিয়েছেন, তার ভিত্তিতেই খসড়া ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। যেহেতু বিষয়টি আমাদের নজরে দিয়েছো। অশেষ ধন্যবাদ। অভিযোগটি অবশ্যই যাচাই-বাছাই করা হবে। এসময় তিনি আরও বলেন, ‘কীভাবে তিনি আওয়ামী লীগপন্থী সংগঠন থেকে জিয়া পরিষদে এলেন কিংবা সদস্য হলেন, সেটির উত্তর সংগঠনের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক ভালো দিতে পারবেন।’ এ বিষয়ে জিয়া পরিষদের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কেউ নতুন সদস্য হতে চাইলে আবেদন করতে হয়। পরে সাধারণ সভায় সকল সদস্যের উপস্থিতিতে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তাকে সদস্যপদ দেওয়া হয়। তবে ড. আজগর হোসেন গত বছরও জিয়া পরিষদের ভোটার তালিকায় ছিলেন। সে কারণেই এবারও তার নাম রাখা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তার সদস্যপদ বাতিল করা হবে। জাতীয়তাবাদী আদর্শের সংগঠনের সদস্য হয়ে একইসঙ্গে অন্য রাজনৈতিক শিক্ষক সংগঠনের সদস্য থাকা গ্রহণযোগ্য নয়।’ এবিষয়ে জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় মহাসচিব অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন বলেন, এটা আমি অবগত নই। আমি যতদূর জানি সে শাপলা ফোরামের সদস্য ছিলো। সে আবার কবে আমাদের ফোরামে আসলো। একসাথে কোনো ব্যক্তিই দুইটা আদর্শ ধারণ করতে পারে না। এটার কোনো সুযোগ নাই। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারিকে আমি এটি নিয়ে জিগ্যেস করবো।
তবে শাপলা ফোরামের ভোটার তালিকায় নাম থাকা একজন শিক্ষক কীভাবে জিয়া পরিষদের সদস্য হিসেবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন এবং বিষয়টি এতদিন সংগঠনের নজরে কেন আসে নি। এ বিষয়ে উভয় সংগঠনের শিক্ষক নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজগর হোসেন বলেন, আমি বিএনপি সরকারের সময়ই নিয়োগ পাওয়া। আমি আগাগোড়াই জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ করি। তবে আওয়ামী সময়ে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিভাগের সিনিয়র শিক্ষকদের চাপে নামটি দেওয়া হয়। ওটা আমার নিজ ইচ্ছায় দেওয়া না। তবে সেসময় নাম দেওয়ার আগে তৎকালীন জিয়া পরিষদের শিক্ষক নেতা তোজাম্মেল হোসেন, বর্তমান উপ-উপাচার্য এম. এয়াকুব আলীকেও অবগত করি। তাদেরকে অবগত করেই নাম দেওয়া হয় আমার। এখন আমি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে নামটি কাটার পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। আওয়ামী সংগঠনে নাম দেওয়াটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে সেসময় মূলত চাপে পড়েই দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, অধ্যাপক ড. আজগর ২০০৩ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে নিয়োগ পান। তখন তিনি জিয়া পরিষদের সদস্য হন। কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন শাপলা ফোরামে যোগ দেন। পরে আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তার নাম জিয়া পরিষদের ভোটার তালিকায় দেখা যায়। এমন ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে নতুন করে স্বচ্ছতা, সদস্যপদ যাচাই এবং সাংগঠনিক জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে।


