মীর ফাহিম ফয়সাল, আলমডাঙ্গা থেকে ॥ চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রামের নাম গোয়ালপাড়া। আড়াই বছর আগে এই গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল তৃতীয় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর নির্মম মৃত্যুতে। আঁখি প্রি-ক্যাডেট স্কুলের শিক্ষার্থী মরিয়ম খাতুনের হাসি থেমে গিয়েছিল এক নৃশংস অপরাধের শিকার হয়ে। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার বিচার চেয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছেন তার স্বজনরা, কেঁদেছেন প্রতিবেশীরা, ক্ষোভে ফুঁসেছে পুরো জনপদ। অবশেষে সোমবার (২০ জুলাই) সেই অপেক্ষার অবসান হলো। চুয়াডাঙ্গার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোক্তাগীর আলম আলোচিত এই ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় একমাত্র আসামি মো. আবুল হোসেন ওরফে ফটিক (২৯)-কে মৃত্যুদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে স্বস্তি ও বেদনার মিশ্র অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। কঠোর পুলিশ পাহারায় দণ্ডিত আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বরের সেই দিনটি আজও ভুলতে পারেননি গোয়ালপাড়ার মানুষ। বেলা ১১টার দিকে মরিয়ম খাতুন তার ছোট বোন আছিয়া ও প্রতিবেশী কয়েকজন শিশুকে নিয়ে বাড়ির পাশের হাড়িভাঙ্গা মাঠে শাক তুলতে যায়। শিশুসুলভ আনন্দে মেতে থাকা সেই মুহূর্তেই তাদের সামনে আসে এক অপরিচিত ব্যক্তি। প্রলোভন দেখিয়ে সে মরিয়মকে ভুট্টা ক্ষেতে নিয়ে যায়। অন্য শিশুদের অপেক্ষা করতে বলে। কিছুক্ষণ পর লোকটি একাই ফিরে আসে। মরিয়ম কোথায়—এ প্রশ্নের জবাবে জানায়, সে পরে আসবে। কিন্তু আর ফিরে আসেনি ছোট্ট মরিয়ম।
সন্দেহ হওয়ায় মরিয়মের মা ও স্বজনরা মাঠে ছুটে যান। এরপর স্থানীয় আলী হোসেনের ভুট্টা ক্ষেতে যে দৃশ্য তারা দেখেন, তা কোনো বাবা-মায়ের জীবনে দেখার নয়। সেখানে পড়ে ছিল মরিয়মের গলাকাটা নিথর দেহ। মুহূর্তেই আনন্দমুখর একটি পরিবার নেমে যায় সীমাহীন শোকের অন্ধকারে। ঘটনার পর মরিয়মের বাবা ভ্যানচালক ইকবাল হোসেন জীবননগর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, জীবননগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলাম উপজেলার গয়েশপুর (বড় মসজিদপাড়া) গ্রামের আবু তাহের মোল্লার ছেলে মো. আবুল হোসেন ওরফে ফটিককে একমাত্র আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার বিচার চলাকালে আসামি চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এছাড়া ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। বিচারকালে ৩১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত আলামত পর্যালোচনা করে আদালত এ রায় প্রদান করেন।
রায় ঘোষণার পর মরিয়মের পরিবার জানিয়েছে, তাদের বুকের শূন্যতা কোনো রায়েই পূরণ হবে না। তবুও আদালতের এই রায়ে তারা ন্যায়বিচারের প্রতিফলন দেখছেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও মনে করছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে এই রায় সমাজে একটি শক্ত বার্তা দেবে। ছোট্ট মরিয়ম আর কখনো স্কুলে যাবে না, বই হাতে হাসিমুখে বন্ধুদের সঙ্গে খেলবে না। কিন্তু তার জন্য উচ্চারিত আদালতের এই রায় যেন প্রতিটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার হয়ে সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।


