মীর ফাহিম ফয়সাল, আলমডাঙ্গা থেকে ॥ একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন, আশা আর অপেক্ষার নাম ছিল রাফিন। মালয়েশিয়া প্রবাসী বাবার কষ্টার্জিত উপার্জনে বড় হয়ে ওঠা কিশোর ছেলেটিকে ঘিরে ছিল পরিবারের অগণিত স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ ভেসে উঠেছে কুতুবপুরের অর্জুন খালের কালো জলে—অর্ধগলিত মরদেহ হয়ে। আলমডাঙ্গা উপজেলার নাগদাহ ইউনিয়নের চিলাভালকি গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী আখতারুজ্জামানের ছেলে রাফিন হাসান গত ৫ জুন বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ভেবেছিলেন হয়তো কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গেছে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও অবস্থান করছে। কিন্তু সময় গড়াতে থাকলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, থানায় সাধারণ ডায়েরি—সবকিছুই করা হয় প্রিয় সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায়। পরিবারের দাবি, নিখোঁজ হওয়ার পর অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাদের কাছে ফোন করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবার। প্রবাসে থাকা বাবা আখতারুজ্জামানও উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাতে থাকেন। প্রতিটি ফোনকল, প্রতিটি খবরের অপেক্ষায় ছিল পরিবার। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষটা হলো এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে। নিখোঁজ হওয়ার ৯ দিন পর শনিবার কুতুবপুর এলাকার অর্জুন খাল থেকে রাফিনের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে চিলাভালকি গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। যে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন মা, সেই সন্তানই ফিরল নিথর দেহ হয়ে। মায়ের বুকফাটা কান্না আর স্বজনদের আর্তনাদে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাফিন ছিল শান্ত-শিষ্ট ও ভদ্র স্বভাবের ছেলে। তার এমন করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই। এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চাঞ্চল্য ও ক্ষোভ। পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, এটি একটি পরিকল্পিত অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির রহস্য উদঘাটন এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। একটি পরিবারের স্বপ্ন, এক মায়ের বুকের ধন, এক প্রবাসী বাবার অপেক্ষা—সবকিছুই যেন থেমে গেল অর্জুন খালের নিস্তব্ধ জলে। রাফিন আর ফিরবে না, তবে তার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন এবং দোষীদের বিচারই এখন শোকাহত পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা।


