বশিরুল আলম, আলমডাঙ্গা থেকে ॥ একসময় প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোকে পুরুষের একচ্ছত্র ক্ষেত্র বলেই মনে করা হতো। সময়ের পরিক্রমায় সেই ধারণা বদলেছে। আজ মেধা, দক্ষতা, সততা ও কর্মনিষ্ঠার শক্তিতে নারীরা শুধু সেই দেয়াল ভেঙেই বেরিয়ে আসেননি, বরং নেতৃত্বের আসনে বসে নতুন ইতিহাসও রচনা করছেন। সেই ইতিহাসেরই এক গর্বিত অধ্যায়ের নাম—চুয়াডাঙ্গা। প্রশাসনিক অঙ্গনে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে সীমান্তবর্তী এই জেলা। প্রথমবারের মতো জেলার জেলা প্রশাসকসহ চার উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে একযোগে দায়িত্ব পালন করছেন পাঁচ নারী কর্মকর্তা। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক বিন্যাস নয়; এটি নারীর অদম্য অগ্রযাত্রা, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের সক্ষমতা এবং সমঅংশীদারিত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক।চুয়াডাঙ্গার দ্বিতীয় নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন লুৎফুন নাহার। তাঁর নেতৃত্বে সদর উপজেলার ইউএনও তিথি মিত্র, আলমডাঙ্গা উপজেলার ইউএনও শাহীনুর আক্তার, দামুড়হুদা উপজেলার ইউএনও লাভলী ইয়াসমিন এবং জীবননগর উপজেলার ইউএনও হিসেবে পদায়ন পাওয়া সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি—সব মিলিয়ে জেলার প্রশাসনিক নেতৃত্বে সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। চুয়াডাঙ্গায় নারী জেলা প্রশাসকের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালের ২৫ জুন জেলার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সায়মা ইউনুস। প্রায় এক দশক পর সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল জেলার ৩০তম জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিসিএস ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি জনবান্ধব, সেবামুখী ও গতিশীল প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।একই সময়ে ধাপে ধাপে চার উপজেলার প্রশাসনিক নেতৃত্বেও যুক্ত হয়েছেন নারী কর্মকর্তারা। গত ২৯ মার্চ সদর উপজেলা ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব নেন তিথি মিত্র। পরে ১১ মে আলমডাঙ্গা উপজেলায় যোগ দেন শাহীনুর আক্তার। এরপর ২৪ জুন জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে লাভলী ইয়াসমিনকে দামুড়হুদা এবং সুমাইয়া সুলতানা এ্যানিকে জীবননগর উপজেলার ইউএনও হিসেবে পদায়ন করা হয়। ২৮ জুন লাভলী ইয়াসমিন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি দায়িত্ব গ্রহণ করলেই প্রশাসনের এই ঐতিহাসিক অধ্যায় পূর্ণতা পাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীদের এই সম্মিলিত নেতৃত্ব কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সেবায় দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও মানবিকতার নতুন বার্তা বহন করছে। মাঠ প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে জনকল্যাণকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, “মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের জন্য ভালো কাজ করছে—এটি তারই প্রমাণ। এই জেলায় আরও দুজন নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বিষয়। ছেলে কর্মকর্তারাও ভালো কাজ করেন। তবে আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, নারীরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তারা যেমন পরিবার সামলান, তেমনি কর্মক্ষেত্রেও নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন।”তিনি আরও বলেন, “দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। চুয়াডাঙ্গার উন্নয়নেও আমরা সবাই মিলে কাজ করতে চাই। এজন্য জেলার সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করছি।”চুয়াডাঙ্গার এই অর্জন শুধু একটি জেলার নয়, বরং বাংলাদেশের প্রশাসনে নারীর ক্রমবর্ধমান নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি। এটি সেই বার্তাই দোস্ত যোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার কোনো লিঙ্গ নেই। সুযোগ পেলে নারীরাও প্রশাসনের কঠিন দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারেন, মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেন এবং ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখতে পারেন।চুয়াডাঙ্গার আকাশে আজ তাই নতুন এক আলোর রেখা। সেই আলো জানিয়ে দিচ্ছে—বাংলাদেশের প্রশাসনে নারীর পদচারণা আর ব্যতিক্রম নয়; এটি আগামী দিনের স্বাভাবিক বাস্তবতা।


