বশিরুল আলম, আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা) থেকে ॥ চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, মানবপাচার দমন এবং সড়ক নিরাপত্তা জোরদারসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সভায় বক্তারা সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধে প্রশাসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাড. মাসুদ পারভেজ রাসেল, সংসদ সদস্য, চুয়াডাঙ্গা-১ সংসদীয় আসন এবং রুহুল আমিন, সংসদ সদস্য, চুয়াডাঙ্গা-২ সংসদীয় আসন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। সভায় সভাপতিত্ব করেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ কামাল হোসেন। এসময় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আদালত সহায়তা কার্যক্রম, সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ, মানবপাচার দমন, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং অনিষ্পন্ন চোরাচালান মামলার অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের সঠিক ও সমন্বিত পরিসংখ্যান প্রস্তুত, জেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটির কার্যক্রম জোরদার এবং জননিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। সন্ত্রাস, মাদক, মানবপাচার ও চোরাচালান প্রতিরোধে পুলিশের অভিযান আরও জোরদার করা হবে। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সভায় মো. শরীফুজ্জামান শরীফ, সাধারণ সম্পাদক, জেলা বিএনপি মাদক ও ধূমপানের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শুধু প্রশাসন বা শিক্ষক নয়—অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। অনেক স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে সিগারেট খেতে দেখা যায়। স্কুলের আশপাশের দোকানগুলোতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে সিগারেট বিক্রি বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভি জে স্কুল ও গার্লস স্কুলে ভর্তির জন্য বিভিন্ন মহল থেকে তদবির এলেও এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান ঠিক আছে কি না, তা তেমনভাবে যাচাই করা হয় না। এ জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের রুটিন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতি মাসে অভিভাবক সমাবেশ আয়োজনের প্রস্তাবও দেন তিনি।সভায় সংসদ সদস্য রুহুল আমিন সীমান্তে জব্দ হওয়া চোরাচালান পণ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সীমান্ত থেকে প্রায় ৯৭ হাজার টাকার মালামাল জব্দ করা হয়েছে, কিন্তু এসব পণ্য বহনকারী কাউকে আটক করা হয়নি এবং কোনো মামলা হয়নি—বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এ বিষয়ে বিজিবি-৬ চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়ন–এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, অনেক সময় সীমান্তের কাঁটাতারের ওপার থেকে ফেনসিডিল বা অন্যান্য পণ্য প্যাকেট করে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। মাদক বহনকারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাঁটাতারের এপারে আসে না। সন্দেহভাজন কাউকে থামতে বললে অনেক সময় তারা সঙ্গে থাকা পণ্য ফেলে পালিয়ে যায়। সীমান্ত এলাকায় ভুট্টাখেত, ঝোপঝাড় ও রাতের অন্ধকারের কারণে অনেক সময় তাদের ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে অভিযুক্তদের আটক করতে বিজিবি সক্ষম এবং এ বিষয়ে আরও তৎপরতা বাড়ানো হবে।
সভায় সংসদ সদস্য অ্যাড. মাসুদ পারভেজ রাসেল আলমডাঙ্গার হারদী এলাকায় ফারুক নামের এক ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পার হলেও এ ঘটনায় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ওই ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পুলিশ কাজ করছে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও বিষয়টি তদন্ত করছে। তিনি জানান, নিখোঁজ ফারুক সাধারণত বাইরে গেলে মোবাইল ফোন সঙ্গে নিতেন, তবে নিখোঁজ হওয়ার দিন তিনি মোবাইল ফোন নেননি। ঘটনাটি পরিকল্পিত নাকি অন্য কোনো কারণে তিনি নিখোঁজ হয়েছেন—সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সভায় বক্তারা সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল রাখতে সংি সব দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।


