এনএনবি : ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সব গ্রন্থাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ‘আপত্তিকর’ বই ও নথিপত্র সরিয়ে ফেলার জন্য একটি বিশাল যৌথ অভিযান শুরু করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবদানের জন্য পরিচিত নেতাদের প্রশংসা বা গুণগান করা হয়েছে- এমন অভিযোগে এই চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৯ জুলাই (২০২৬) ভারত সরকারের জারি করা এক নির্দেশনায় কাশ্মীরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাদের বই, জার্নাল, গবেষণাপত্র, ডক্টরাল থিসিস ও ডিজিটাল রিসোর্স কঠোরভাবে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মোদী সরকারের দাবি, দেশের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও অখ-তার জন্য হুমকিস্বরূপ যে কোনো বিভ্রান্তিকর এবং আপত্তিকর প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করাই এই নির্দেশের মূল লক্ষ্য।
কেন এই আকস্মিক তোলপাড়? কাশ্মীরে সাম্প্রতিক এই ধরপাকড় ও কড়াকড়ি শুরু হয় চলতি মাসের শুরুতে। ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতা সুনীল শর্মা কাশ্মীরের দুই শিক্ষাবিদ হিলাল আহমেদ ও সন্তোষ মীনার লেখা ‘পার্সোনালিটিস অ্যান্ড লিজেন্ডস অব জে অ্যান্ড কে’ (চবৎংড়হধষরঃরবং ধহফ খবমবহফং ড়ভ ঔ্ক) বইটি নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন। ২৪০ পৃষ্ঠার এই বইটিতে কাশ্মীরের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কবি ও লেখকদের পাশাপাশি সালমান রুশদি, হরি কুঞ্জরুর মতো বিশ্বখ্যাত লেখকদের জীবনী স্থান পেয়েছে। তবে বিপত্তি বেঁধেছে কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে। বইটিতে ১৯৮৪ সালে ভারতের আদালতের নির্দেশে ফাঁসি হওয়া কাশ্মীরি নেতা মকবুল ভাটকে ‘শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া ২০১০ সালের কাশ্মীর আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও বর্তমানে কারাগারে বন্দি মাসরাত আলম ভাটের নাম রয়েছে বইটিতে। প্রয়াত বর্ষীয়ান হুররিয়াত নেতা সৈয়দ আলী শাহ গিলানির একটি উক্তিতে কাশ্মীরকে ‘জাতিসংঘের অধীনে রাজনৈতিক সমাধানের অপেক্ষায় থাকা একটি বিরোধপূর্ণ অঞ্চল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিজেপি নেতা সুনীল শর্মা একে ‘অ্যাকাডেমিক জিহাদ’ বলে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, এই বইগুলো কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্ম ও শিশুদের মন বিষিয়ে তুলছে ও তাদের আবারও বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অভিযোগের পরপরই কাশ্মীর পুলিশ দুই বইয়ের প্রকাশককে গ্রেফতার করে ভারতের অখ-তা বিপন্ন করার মামলা ঠুকে দেয়। ‘বই এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক’ কাশ্মীরের সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক ও লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ এই আকস্মিক সরকারি আদেশে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্রীনগরের এক প্রবীণ সাংবাদিক আল জাজিরাকে বলেন, কাশ্মীরের ইতিহাস নিয়ে লেখা বা পড়ার মধ্যে এখন বিশাল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিজের ঘরে রাখা পুরনো মানবাধিকার রিপোর্ট বা আর্কাইভাল বইগুলোকেও এখন ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা দেওয়া হতে পারে। সেই ভয়ে আমি নিজের বুকশেলফ খালি করে ফেলছি। কাশ্মীরে বই-ই এখন নতুন আতঙ্ক। একইভাবে শ্রীনগরের বই বিক্রেতা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন বিভাগের লাইব্রেরিয়ানরা চরম বিভ্রান্তিতে পড়েছেন যে কোন বইটি রাখা ‘জাতীয় স্বার্থে’ হবে আর কোনটি ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বলে গণ্য হবে। বিশ্লেষকদের উদ্বেগ কাশ্মীরে বইয়ের ওপর এমন বিধিনিষেধ এবারই প্রথম নয়। গত বছরও ভারতের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে অরুন্ধতী রায়, এ জি নূরানি ও সুমন্ত্র বোসের মতো প্রখ্যাত লেখক ও গবেষকদের ২৫টি বই নিষিদ্ধ করেছিল কর্তৃপক্ষ। এর আগে ইসলামিক স্কলার আবুল আ’লা মওদুদীর লেখা ৬৬৮টি বই শ্রীনগরের বিভিন্ন দোকান থেকে জব্দ করা হয়। সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘ভীতি প্রদর্শনের চর্চা’ ও ‘পড়ার অধিকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা’ বলে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক অনুরাধা ভাসিন (যার নিজের বই ‘দ্য ডিজম্যান্টল্ড স্টেট’ গত বছর নিষিদ্ধ হয়েছিল) বলেন, ‘এখানে-ওখানে একটু আপত্তিকর কিছু থাকলেই বা কী আসে যায়? বই তো আর বোমা নয়! শেষ কবে কেউ একটা বই পড়ে হাতে বন্দুক তুলে নিয়েছে?’ যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস কলেজ অব লিবারেল আর্টসের কাশ্মীরি নৃবিজ্ঞানী মোহাম্মদ জুনায়েদ এই অভিযানকে ‘মেমোরিসাইড’ বা ‘স্মৃতিহত্যা’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এটি কাশ্মীরের তরুণদের নিজেদের অতীত ইতিহাস ও বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।


