এনএনবি : ইরানের ওপর টানা ষষ্ঠ রাতের মত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের চলমান লড়াইয়ের মাঝে এই হামলা চালানো হল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরও দুর্বল করে দেওয়ার লক্ষ্যেই তারা এই অভিযান চালাচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় আঘাত হেনেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এবার হরমুজগান প্রদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতেও হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে বন্দর আব্বাসের পশ্চিমে অবস্থিত একটি সেতুতে হামলার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছে বিবিসি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে তাদের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে। এর আগে এপ্রিলে ট্রাম্প যখন ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে বোমা হামলার কথা বলেছিলেন, তখন জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিক বা বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানো ১৯৪৯ সালের জেনিভা কনভেনশন অনুযায়ী ‘যুদ্ধাপরাধ’। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি মঙ্গলবার রাত থেকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেন্টকম জানিয়েছে, এই অবরোধের অংশ হিসেবে ওমান উপসাগরে একটি তেলের ট্যাংকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে মার্কিন মেরিন সেনারা। এছাড়া অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ১৩ এপ্রিল থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত প্রথম দফার অবরোধে মার্কিন বাহিনী ইরানের ৯টি জাহাজ অচল করে দিয়েছিল এবং ১৪০টির বেশি জাহাজের পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিল। নতুন করে শুরু হওয়া এই বৈরীতা দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানের প্রাথমিক চুক্তিটিকে আরও বড় সংকটের মুখে ফেলেছে। এই সংঘাতের মধ্যেও হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বৃহস্পতিবার বলেছেন, ট্রাম্প এখনো ইরানের সঙ্গে কূটনীতির পথ খোলা রেখেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেওয়া কথা থেকে ইরান যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, প্রেসিডেন্ট তখন তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবেন। তবে একই সঙ্গে তিনি কূটনীতির পথও সবসময় খোলা রাখেন।” লেভিট দাবি করেন, ইরান এখনো একটি চুক্তি করতে চায় এবং মার্কিন প্রশাসন তাদের সঙ্গে কথা বলছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজে হামলা চালালে ট্রাম্প ইরানকে কোনো ছাড় দেবেন না এবং তাদের এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে তেহরান ওই জলপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বৃহস্পতিবার তেহরান দাবি করে, তারা জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে মার্কিন বাহিনীও প্রণালির একাধিক স্থানে টানা ৬ ঘণ্টা ধরে ব্যাপক হামলা চালায়। এর আগে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, তাদের সমঝে চলতে হবে। আলোচনায় না ফিরলে আরও সামরিক হামলার মুখে পড়তে হবে। ট্রাম্পের ওই হুমকির পরই মূলত দুই দেশের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। এদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা না হলে কোনো চুক্তি মানবে না তেহরান। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা নির্ভর করে। এদিকে রণক্ষেত্রের বাইরে দুই দেশের মধ্যে মার্কিন বন্দি মুক্তি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে এ বিষয়ে ইরানের প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আটক মার্কিন নাগরিক ডেনা কারারিকে মুক্তি দেওয়াকে তিনি ‘সদিচ্ছার নিদর্শন’ বলে বর্ণনা করেন। কারারির আইনজীবী জ্যারেড গেনসারও বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পথে রয়েছেন। তবে এর পরদিনই ইরানের বিচার বিভাগ ওই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে বলে, তাদের কারাগার থেকে কোনো মার্কিন বন্দিকে মুক্তি বা বিনিময় করা হয়নি।


