কৃষি প্রতিবেদক ॥ কিছু মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেন নিজের জন্য। আবার কিছু মানুষ জন্ম নেন পৃথিবীকে একটু সুন্দর করে রেখে যাওয়ার জন্য। ইঞ্জিনিয়ার টুটুল সেই বিরল মানুষদের একজন, যার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন প্রকৌশলী নন তিনি একজন গাছপাগল মানুষ, একজন সমাজ সেবক, একজন সবুজ স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।তিনি ৩ দশকে প্রায় ১১/১২ লক্ষ গাছের চারা রোপন ও বিতরন করেছেন ইতিমধ্যে, তার স্বপ্ন ২০ লক্ষ গাছের চারা রোপন আর বিতরন করবেন তার জীবদ্দশায়।
আজ থেকে প্রায় ৩২ বছর আগে, যখন পরিবেশ রক্ষা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সমাজে তেমন কোনো আলোচনা ছিল না, যখন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ছিল না এতটা জনপ্রিয়, তখনই এক তরুণ প্রকৌশলী নিজের হৃদয়ে লালন করেছিলেন এক অসাধারণ স্বপ্ন তিনি গাছ লাগাবেন, মানুষকে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করবেন, আর সবুজে ভরে তুলবেন এই দেশ।
১৯৯৫ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর নিজের বেতনের সামান্য কিছু টাকা বাঁচিয়ে তিনি কিনতেন বিভিন্ন জাতের ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা। তারপর ছুটে যেতেন গ্রামের স্কুলে, শহরের বিদ্যালয়ে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতেন একটি করে সবুজ স্বপ্ন। তিনি শুধু চারা দিতেন না; তিনি দিতেন ভবিষ্যতের আশা।
শিশুদের সামনে দাঁড়িয়ে বলতেন “গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়। গাছ বৃষ্টি আনে। গাছ না থাকলে নদী শুকিয়ে যাবে, ফসল হবে না, পৃথিবী মরুভূমিতে পরিণত হবে। গাছ আমাদের ছায়া দেয়, ফল দেয়। জীবনের কঠিন সময়ে একটি বড় গাছও হতে পারে পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই আজ একটি গাছ লাগাও, আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দাও।”
শিশুরা মুগ্ধ হয়ে শুনত। তারপর আনন্দভরে চারাগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরত। যতœ করে রোপণ করত নিজের আঙিনায়। অনেক বছর পর সেই শিশুরাই বড় হয়ে ফল হাতে নিয়ে আবার ফিরে আসত টুটুলের কাছে। বলত— “স্যার, এটা আপনার দেওয়া গাছের প্রথম ফল।” এই একটি মুহূর্তই যেন তাঁর সমস্ত ক্লান্তির পুরস্কার হয়ে উঠত। টুটুল শুধু একটি-দুটি বিদ্যালয় নয়, গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইঞ্জিনিয়ার টুটুল সবুজের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলার প্রায় দুই শতাধিক স্কুল, কলেজ ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ জেলায়। তাঁর পদচারণায় মুখর হয়েছে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে, আর সেই ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে গাছ তুলে দেওয়া জরুরি। তাঁর কাছে একটি চারাগাছ কখনো শুধু একটি উদ্ভিদ ছিল না; সেটি ছিল একটি স্বপ্ন, একটি দায়িত্ব, একটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি। তাই তিনি শিশুদের হাতে তুলে দিতেন দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধি ও ফুলের গাছের চারা। উন্নত জাতের আম, কাঁঠাল, লেবু, আমড়া, জাম, আতা, পেয়ারা, সবেদা এমন অসংখ্য ফলদ গাছের পাশাপাশি থাকত মেহগনি ও নিমের মতো মূল্যবান বনজ বৃক্ষ। শুধু ফল বা কাঠের গাছেই তাঁর ভালোবাসা সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন, প্রতিটি বিদ্যালয় ও প্রতিটি বাড়ির আঙিনা রঙিন ফুলের সৌন্দর্যে ভরে উঠুক। তাই তাঁর বিতরণ করা চারার ঝুড়িতে থাকত রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, জারুল, বকুল, হাসনাহেনা, কামিনী, গন্ধরাজ, রঙ্গন, গোলাপ, জবা, বাগানবিলাস, পানচেটিয়া এবং আরও নানা জাতের ফুলের গাছ। কিন্তু এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। দিনভর সরকারি দায়িত্ব পালন করার পর, যখন সবাই বিশ্রাম নিত, তখন শুরু হতো তাঁর আরেকটি যুদ্ধ। রাতভর জেগে তিনি বেসরকারি বাড়ির নকশা ও ডিজাইনের কাজ করতেন। সেই কাজ থেকে যা উপার্জন হতো, তার প্রায় পুরোটাই ব্যয় করতেন গাছের চারা কেনার পেছনে। অনেক সময় এমনও হয়েছে সংসারের বাজার করার টাকাও খরচ হয়ে গেছে চারাগাছ কিনতে। নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনার আগে তিনি ভেবেছেন—”এই টাকায় আরও কতগুলো গাছ কেনা যায়?” বিলাসিতা কখনো তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ তাঁর নেশা ছিল একটাই—গাছ লাগানো। তারপরও তাকে বিভিন্ন ভাবে অপমানিক লাঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে গাছ বিতরন করতে গিয়ে, তার অপরাধ বাচ্চারা তাকে ভালোবাসেই,,,,,,তাই বিতরন করত দেওয়া হবে না গাছের চারা স্কুলে, আরো কত কি , কিন্তু টুটুল তো থামবার পাত্র না, তিনি জীবনের ঝুকি নিয়ে বিতরন করে চলেছেন গাছের চারা , বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি পরিবেশ বিষয়ক লেখা পড়তেন। জানতে পেরেছিলেন, পৃথিবীর বন ধ্বংস হচ্ছে দ্রুত। মানুষের লোভে কাটা পড়ছে লাখ লাখ গাছ। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বনভূমি। এমনকি পৃথিবীর “ফুসফুস” নামে পরিচিত আমাজন বনও রক্ষা পাচ্ছে না। সেদিনই তিনি নিজের কাছে একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন— “সবাই যদি গাছ কাটে, আমি অন্তত গাছ লাগাব। সবাই যদি নীরব থাকে, আমি অন্তত মানুষকে সচেতন করব।” সেই প্রতিজ্ঞাই আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। গত ৩২ বছরে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন। লাখো শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দিয়েছেন সবুজের উপহার। নিজের হাতে রোপণ ও বিতরণ করেছেন প্রায় ১১ থেকে ১২ লক্ষ গাছের চারা।
টুটুল শুধু একটি-দুটি বিদ্যালয় নয়, গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইঞ্জিনিয়ার টুটুল সবুজের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলার প্রায় দুই শতাধিক স্কুল, কলেজ ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ জেলায়। তাঁর পদচারণায় মুখর হয়েছে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে, আর সেই ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে গাছ তুলে দেওয়া জরুরি। তাঁর কাছে একটি চারাগাছ কখনো শুধু একটি উদ্ভিদ ছিল না; সেটি ছিল একটি স্বপ্ন, একটি দায়িত্ব, একটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি। তাই তিনি শিশুদের হাতে তুলে দিতেন দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধি ও ফুলের গাছের চারা। উন্নত জাতের আম, কাঁঠাল, লেবু, আমড়া, জাম, আতা, পেয়ারা, সবেদা—এমন অসংখ্য ফলদ গাছের পাশাপাশি থাকত মেহগনি ও নিমের মতো মূল্যবান বনজ বৃক্ষ। শুধু ফল বা কাঠের গাছেই তাঁর ভালোবাসা সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন, প্রতিটি বিদ্যালয় ও প্রতিটি বাড়ির আঙিনা রঙিন ফুলের সৌন্দর্যে ভরে উঠুক। তাই তাঁর বিতরণ করা চারার ঝুড়িতে থাকত রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, জারুল, বকুল, হাসনাহেনা, কামিনী, গন্ধরাজ, রঙ্গন, গোলাপ, জবা, বাগানবিলাস, পয়েনসেটিয়া (পানচেটিয়া) এবং আরও নানা জাতের ফুলের গাছ। তাঁর স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়। তিনি ঘোষণা করেছেন— “আমি জীবিত অবস্থায় ২০ লক্ষ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করব, ইনশাআল্লাহ।” আজ তাঁর বয়স বেড়েছে। শরীর আগের মতো শক্তিশালী নয়। কিন্তু স্বপ্ন এখনও তরুণ। আজ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে তাঁর সন্তান সাকিব। বাবা-ছেলে যখন বাড়ির নকশার কাজে দেশের বিভিন্ন জেলায় যান, তখন শুধু নকশা নিয়েই ফেরেন না। সঙ্গে থাকে কিছু চারাগাছ। কাছাকাছি কোনো স্কুল খুঁজে বের করেন। তারপর শিশুদের হাতে তুলে দেন ভবিষ্যতের সবুজ পৃথিবীর বীজ। তাঁদের কাছে প্রতিটি চারা শুধু একটি গাছ নয়; একটি স্বপ্ন, একটি দায়িত্ব, একটি আমানত। আজ দেশে সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন—সকলেই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করছে। এই দৃশ্য দেখে ইঞ্জিনিয়ার টুটুলের চোখে আনন্দের জল আসে। তিনি ভাবেন— “আমি একা শুরু করেছিলাম। আজ হাজার হাজার মানুষ এই পথে হাঁটছে। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?” তিনি কখনো কোনো পুরস্কারের জন্য কাজ করেননি। কখনো সম্মাননা বা প্রচারের আশায় গাছ লাগাননি। তিনি শুধু বিশ্বাস করেন— “মানুষ একদিন চলে যাবে, কিন্তু একটি গাছ শত বছর বেঁচে থেকে মানুষের উপকার করবে। তাই পৃথিবীর জন্য রেখে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর উপহার একটি গাছ।” ইঞ্জিনিয়ার টুটুল আজও স্বপ্ন দেখেন—একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু অন্তত একটি করে গাছ লাগাবে। প্রতিটি পরিবার বছরে অন্তত একটি গাছ রোপণ করবে। সেই দিন এই দেশ আরও সবুজ হবে, আরও সুন্দর হবে। তিনি সকলের কাছে শুধু একটি দোয়াই চান— “মহান আল্লাহ যেন আমাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই কাজ করে যাওয়ার তাওফিক দেন। আমি চাই, আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত একটি করে গাছ লাগিয়ে যেতে, একটি করে শিশুর হাতে সবুজ স্বপ্ন তুলে দিতে। কারণ আমি বিশ্বাস করি—একটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ নয়; একটি সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর ভিত্তি স্থাপন করা।”হয়তো একদিন মানুষ তাঁর নাম ভুলে যাবে। কিন্তু তিনি যে লাখো গাছ পৃথিবীর বুকে রেখে যাচ্ছেন, সেগুলো বাতাসে দুলে দুলে আগামী প্রজন্মকে বলে যাবে— “একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের সুখের চেয়ে পৃথিবীর সবুজকে বেশি ভালোবেসেছিলেন।”


