এনএনবি : বাংলাদেশের সরকারি পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করতে ২৫ কোটি ডলার সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। স্ট্রেনদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি প্রকল্পের আওতায় এ অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। রোববার (২৮ জুন) সংস্থাটির ঢাকা অফিস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলোÑ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিকল্পনা বিভাগ, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি এবং অডিটর জেনারেল ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়। সংস্থাটি জানায়, উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করতে শক্তিশালী সরকারি প্রতিষ্ঠান, অধিকতর স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উন্নত তথ্যের প্রয়োজন। কিছু অগ্রগতি হলেও সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ডেটা সিস্টেম, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং রাজস্ব আদায়ের ঘাটতিগুলো এখনো দক্ষতা সীমিত এবং দেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে, ‘স্ট্রেনদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ (এসআইটিএ) প্রকল্পটির মাধ্যমে ডিজিটাল রূপান্তর, উন্নত ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সরকারের মূল সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে আধুনিকীকরণে সহায়তা করা হবে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হলোÑ পাঁচটি প্রধান প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকীকরণ এবং সরকারি খাতে সেবা প্রদান ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে সুশাসন ও সরকারি খাতের কার্যকারিতা শক্তিশালী করা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো: একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি নির্ধারণের জন্য উচ্চমানের তথ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড: কর কমপ্লায়েন্স ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়াতে অটোমেশন, ই-ইনভয়েসিং এবং সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে কর প্রশাসনকে আধুনিকীকরণ করা। পরিকল্পনা বিভাগ: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, এআই চালিত অ্যানালিটিক্স এবং রিয়েল টাইম মনিটরিং টুলের মাধ্যমে সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি শক্তিশালী করা। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি: দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং অর্থের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে উন্নত ডিজিটাল ফিচারসহ ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট সিস্টেমের কার্যকারিতা বাড়ানো।
অডিটর জেনারেল ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়: অডিট বা নিরীক্ষা প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজ করা এবং আর্থিক তদারকি ও জবাবদিহি জোরদার করা। যেহেতু নিরীক্ষার ফলাফল সময়োপযোগী হলে দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তাই এ প্রকল্পের লক্ষ্য অডিট রিপোর্টিংয়ের সময় ৭২ মাস থেকে কমিয়ে ৯ মাসে নামিয়ে আনা। বিশ্বব্যাংক বলছে, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল ভিত্তি হলো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ভিত্তি হিসেবে কাজ করা ব্যবস্থাগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এ প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বস্ত ও কার্যকর সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। উন্নত তথ্য উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, ক্রয় এবং অডিটের উন্নতির জন্য পাঁচটি প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এ অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া সুশাসন ও সরকারি খাতের কার্যকারিতা বাড়াতে পাঁচটি প্রধান সরকারি সংস্থার ডিজিটাল ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ৪৫ কোটি ডলার অনুমোদন এদিকে, দেশের ব্যাংকিং খাতের ভিত মজবুত করা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক বোর্ড। ২৪ জুন সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড মিটিংয়ে এই অর্থ অনুমোদন করা হয়েছে।
‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ শীর্ষক এই প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। একই সঙ্গে এই ঋণ ব্যাংক খাতের সংকট নিরসন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করবে। রোববার সংস্থাটির ঢাকা অফিস থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। বিশ্বব্যাংকের এই অর্থায়ন মূলত আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন বৃদ্ধি এবং বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অগ্রাধিকারকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। এর মধ্যে রয়েছে আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, একটি কার্যকর জরুরি তারল্য সহায়তা কাঠামো প্রতিষ্ঠা, ব্যাংক পুনর্গঠন কৌশল তৈরি এবং সরকারি ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত সংস্কার। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাত দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও অনৈতিক সুবিধার কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩২ শতাংশের বেশি, যা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের (৭.৯%) চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেসমে বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার যে লক্ষ্য বাংলাদেশের রয়েছে, তার জন্য একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক খাত অপরিহার্য। তবে দেশের ব্যাংকিং খাত, যা মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ ধারণ করে, বর্তমানে তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে।
এই প্রকল্প বাংলাদেশকে এমন কিছু প্রয়োজনীয় হাতিয়ার, ব্যবস্থা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে যা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের রক্ষা করবে, আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করবে, যাতে এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামোকে আধুনিকায়ন ও উন্নত করা হবে। যা ক্রমবর্ধমান সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলা এবং খাতভিত্তিক ডেটা ও অ্যানালিটিক্সের ঘাটতি দূর করতে সাহায্য করবে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়বে, তথ্য-ভিত্তিক ও ঝুঁকি-ভিত্তিক তদারকি জোরদার হবে এবং আর্থিক খাতের সামগ্রিক স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার এবং বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্পেশালিস্ট তোশিয়াকি ওনো জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি মূলত সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করতে এবং ব্যাংকিং খাতের চাপ ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।


