কাগজ প্রতিবেদক ॥ কুষ্টিয়া শহরের আড়–য়াপাড়া রজব আলী চৌধুরী সড়কে এই এলাকাটি ছিল হরিজন, দাসসহ বিভিন্ন গোত্রের সনাতনি ধর্মাবলম্বী অধ্যুষ্যিত এলাকা। চারিদিকে বড় বড় কাশবন মাঝে এসব নৃতাত্বিক জনগোষ্টির অল্প-বিস্তর কিছু বসবাস। পুরো শহর জুড়েই নি¤œ, উচ্চ, মধ্যবিত্ত শুধুমাত্র সনাতনি ধর্মাবলম্বীদের বসবাস। সেই আঠার শতকে একঘর মুসলমান ছিলেন না এখানে। সুদুর ইরাকের বাগদাদ নগরী থেকে এই গহিন অরণ্যে এসে আস্তানা গাড়ে হযরত নফর শাহ ( রাঃ) বুগদাদী। জঙ্গলের মাঝে ছোট্র একটা আস্তানা গেড়ে শুরু করেন ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজ। কবে কখন কিভাবে এই চিশতিয়া তরিকার আধ্মত্বিক মহাপুরুষের প্রয়ান ঘটে তা কেউ বলতে পারে না। গহিন জঙ্গলের মধ্যেই গড়ে উঠে উচু একটা কবর। দিনে দিনে সেটি রওজা শরিফে রুপ লাভ করে। প্রতিবেশী হরিজন, দাসরাই মাঝারের শিন্নি খেয়ে তাদের দিনাতিপাত করেছেন বহু বছর। বিনিময়ে তাকে ভক্তি মাজার দেখা শুনা ও পরিস্কার-পরিচ্ছন করছেন। তিনি কোন ধর্মের কোন গোত্রের তা তাদের জানার বিষয় নয়। তিনি একজন জাগ্রত মানুষ। মহাপুরুষ, তার কাছে অনেক কিছু পেয়েছেন। তাই আজও ভক্তি করেন এ সকল সনাতনী ধর্মাবলম্বী মানুষ। এলাকার রবিদাস সম্প্রদায়ের দিনওয়া, হরিজন গোপাল, আশুদাস ও সবিতা রাণী জানালেন, সেই বাল্যকাল থেকে তারা বাবা নফর শাহ’র এই মাজারকে দেখে আসছেন। আগে এখানে এত জাকজমকপুর্ণ ছিল না। শুনেছে অনেক গহিন্য অরণ্য ছিল। তার মাঝেই তিনি এসেছিলেন এখানে। এখানে এসে তিনি প্রথমে ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তার মিষ্টভাষী, আর ধর্মপরায়নতায় মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। তারা ছোট বেলায় তার দরবার থেকে বিভিন্ন সময়ে শিন্নি খেয়ে আসছে। এখনও খান। আগে তাদের সম্প্রদায়ের মানুষই মাজারকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখতো। এখন কমিটি হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে থেকে খাদেম দিয়ে এটা দেখভাল করা হয়। তারা আরও জানায়, বহু দেশ থেকে এখানে মানুষ মানত করে। ভালোও হয়। প্রতি বছর চৈত্র মাসে এখানে ওরশ হয় তখন হাজার হাজার মানুষ এখানে মিলিত হয়। চাঁদের হাট বসে। মেলা বসে। চিশতিয়া তরিকার অনুসারী হযরত নফর শাহ’র মাজারে শুধু সনাতনী ধর্মাবলম্বীরাই নয় বাঙ্গালী মুসলিম নারী-পুরুষ ভক্তের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। চাকুরী, লেখাপড়া, অসুস্থ্যতা, সন্তানদের নানা সমস্যার সমাধানে এখানে আসেন প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ। নিজেই নয় পারিবারিক ভাবেই সকলে এখানকার ভক্ত। অনেকে স্বপ্নেও দেখেছেন আধ্মাত্বিক সুফী সাধক হযরত নফর শাহকে। কথা হয় আড়–য়াপাড়ার বক্কার মিয়ার সাথে। তিনি জানান, বাবা নফর শাহ একজন আধ্মাত্বিক মানুষ। তাকে জানতে-বুঝতে হলে এখানে সময় দিতে হবে। আমরা এখানে বেশির ভাগ সময় থাকি তাঁকে অনুভব করি। অনেক দিন আগে তাঁকে স্বপ্নে দেখার পর থেকে আমি বেশির ভাগ সময়ই মাজারেই থাকি। রাহিনী বটতলার গৃহবধু সাথী ইসলাম এসেছেন, তার ৫ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে। এক মেয়ে হওয়ার পর ১২ বছর পর একটি ছেলের জন্য এখানে তিনি চাররাকাত নফল নামাজ পড়ে বাবা নফর শাহের মাজারে মানত করেন। তার পরেই একটি পুত্র সন্তান হয় তার। এখন ছেলেটি সুস্থ্য আছে। শুধু তিনি নয় তার পরিবারের শ^শুর-শ^াশুড়ীসহ সকলেই এখানকার ভক্ত। কথা হয় মাজারের খাদেম আল চিশতিয়া এস এম লিয়াকত আলী জানান, আগে ঢাকা কুতুব বাগ দরবার শরীফে খাদেম ছিলেন। সঠিক ভাবে কবে কখন তিনি দেহত্যাগ করেছেন তা জানার কোন উপায় নেই। এখানে তিনি আসার পর একদিন স্বপ্নে বাবা নফর শাহকে দেখেছেন। তিনি সবুজ পোশাক পরিহিত ছিলেন। তাঁর মত মহামানবের মাজারে খেদমত করতে পেরে নিজে জান্নাতি হবেন এমন আশা করেন তিনি। কুষ্টিয়া শহরসহ সারা বাংলাদেশে বাবা নফর শাহ (রাঃ) হাজার হাজার ভক্ত আছে। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার আর শুক্রবার। সকাল থেকে প্রাইভেট কার নিয়েও অনেকে আসেন । এখানে এসে রান্না করেও তবারক বিতরণ করেন। ওলি আউলিয়ার দরবারে ভক্তি করা শ্রদ্ধা করায় মানা নেই। তবে এখানে সিজদা দেয়া নিষেধ করা আছে। কোন প্রকার মাদকদ্রব্য নিয়ে ভেতরে প্রবেশ নিষেধ আছে। কোন প্রকার খারাপ প্রকৃতির মানুষের এখানে আশ্রয় নেই। বাল্যকাল থেকে দেখেছেন এখানে গহিন জঙ্গল ছিল, ডোবা ছিল। শহরের প্রয়াত কেরামত মস্তান প্রথম এ রওজাটি সংস্কার করেন। পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে মাজারের বর্তমান পরিপুর্ণ রুপ হয়েছে। প্রতি বছর চৈত্র মাসে তিনদিন ব্যাপী ওরশ হয়। তখন দেশ ও বিদেশ থেকে কয়েক হাজার নারী-পুরুষের সমাগম ঘটে এখানে। মুসলমানের চাইতে সনাতনী ধর্মাবলম্বী ভক্তের সংখ্যাই বেশি। ভালো, খারাপ সকল মানুষের অথর্ই এখানে আছে। দায়িত্বপাওয়ার পর থেকে সব কিছু সঠিক ভাবে পরিচালনা করার চেষ্টা করছেন বলে জানালেন মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ রেজাউল হক। তিনি আরও জানান, আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করি মাজারের যতœ নেয়ার। এখানে কোন প্রকার মাদকদ্রব্য ব্যবহার, বহন, জটাধারী ফকির সাধুদের আনাগোনা নেই। শরিয়ত মোতাবেক এখানে ভক্তরা আসেন বাবার মাজারটি জিয়ারত করেন। ভক্তি করেন। কেউ তবারক নিয়ে এসে এখানে বিতরণ করেন। প্রতি বছর চৈত্র মাসে এখানে বাবা নফর শাহ (রাঃ) স্মরণে ওরশ হয়। তখন প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। তিনদিন ব্যাপী চলে ওরশ। তিনি জানান, এখানে সিন্ধুকে যা জমা হয় হাদিয়া। তার জন্য রাজার হাট জনতা ব্যাংকে একটি একাউন্ট খোলা আছে সেখানে জমা রাখা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে মাজার নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও এখানে সে সবের কোন বালাাই নেই। প্রতিদিন দূর– দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা কেউ দোয়া ও মানত করেন, কেউ আবার নীরবে বসে খোঁজেন মানসিক শান্তি আর ভরসা।


