কাগজ প্রতিবেদক ॥ উন্নয়ন তহবিলের টাকায় কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ধুবইল ইউনিয়নের গোবিন্দগুনিয়া গ্রামে একটি কালভার্টের অ্যাপ্রোচ নির্মাণ করা হয়েছে। বিল-ভাউচার দাখিল করে প্রকল্পের পুরো টাকাও উত্তোলন হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে ওই প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু একটি-দুটি নয়, মিরপুর উপজেলার এরকম ১৭টি প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। অথচ উন্নয়ন তহবিলের কাগজে-কলমে ১৭ প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য রয়েছে। উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে এসব প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৩৪ লাখ টাকা লোপাট করেছেন সাবেক এই নির্বাহী কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রকৌশলী জহীর মেহেদী হাসানের যোগসাজশে পিআইসি সভাপতিদের ব্যবহার করে ইউএনও এ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অভিযুক্ত সাবেক ইউএনও নাজমুল ইসলাম বর্তমানে মাগুরার শ্রীপুরে কর্মরত রয়েছেন। তবে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই বলে জানান বর্তমান মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত আমান আজিজ। তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ধুবইল ইউনিয়নের গোবিন্দগুনিয়া গ্রামে একটি কালভার্টের অ্যাপ্রোচ নির্মাণের জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নথিপত্র অনুযায়ী প্রকল্পটির পিআইসি কমিটির সভাপতি সোহেল রানা বিল উত্তোলন করেছেন। কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, ওই স্থানে কালভার্টের কোনো অস্তিত্ব নেই। এলাকাবাসীর ভাষ্য, ১০-১২ বছর আগে তারা নিজেদের অর্থায়নে কালভার্ট নির্মাণ করেছিলেন। ভুয়া প্রকল্পের বিষয়টি জানাজানি হলে বিল ফাইলের কাগজে ইউনিয়নের নাম ওভাররাইটিং করে ‘বারুইপাড়া ইউনিয়ন’ লেখা হয়। অথচ ওই ইউনিয়নে গোবিন্দগুনিয়া নামে কোনো গ্রামই নেই। এ বিষয়ে পিআইসি সভাপতি সোহেল রানা জানান, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি খুব বেশি অবগত নই। আমার কাছে চেক এসেছে, আমি স্বাক্ষর করে দিয়েছি। এর বেশি কিছু আমি জানি না। একজন এসে বলল, আমি অমুকের প্রতিনিধি, তাই আমি স্বাক্ষর করে দিয়েছি।’ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ প্রকল্পে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ কাজের পিআইসি কমিটির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘ইউএনও’কে খুশি করতে আমি চেকে সই করে দিয়েছি। এর বেশি কিছু আমি জানি না। কারণ, এইটুকু কাজে ইউএনও সাহেবকে সহযোগিতা না করলে পরবর্তীতে ভালো কোনো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে না। ভালো সম্পর্ক রাখতেই আমি স্বাক্ষর করেছি।’ তবে কোনো চিকিৎসা সামগ্রী বুঝে পাননি বলে জানান মিরপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. পিজুস কুমার। গাছের চারা রোপণ ও চেয়ারম্যান ভবন মেরামত কাজের ক্ষেত্রেও একই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও পিআইসি কমিটির সভাপতি জামসেদ আলী জানান, ‘ইউএনও যদি বলেন এই কাজে স্বাক্ষর করে দেন। আমাদের কিছু করার থাকে না। আমি কোনো টাকা উত্তোলন করিনি। আমাকে শুধু স্বাক্ষর করতে বলেছেন, আমি স্বাক্ষর করে দিয়েছি।’ মিরপুর পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ইব্রাহীম আলী জানান, ‘ইউএনও নিজের পছন্দের লোকজনকে পিআইসি কমিটির সভাপতি বানিয়ে যা ইচ্ছা তাই করেছেন। কাকে কীভাবে পিআইসি কমিটির সভাপতি বানাতেন এসব ব্যাপারে আমরা কিছুই জানতাম না।’ ইউএনও নাজমুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ‘কোনো কোনো পিআইসি কমিটির সভাপতি কাজ সম্পর্কে হয়তো অতটা ওয়াকিবহাল নন। স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। সরকারি কাজ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে।’ একেবারে শতভাগ কাজ করেছি এমনটা নয়। তবে কাজ না করে টাকা উত্তোলন, এটা হতে পারে না।’ উপজেলা প্রকৌশলী জহীর মেহেদী হাসান বলেন, কাজ না করে টাকা উত্তোলনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সব প্রকল্পে কাজ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। স্থানীয় সরকার বিভাগ কুষ্টিয়ার উপপরিচালক (উপসচিব) আহাম্মেদ মাহাবুব উল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগগুলো আমরা আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করব। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


