কাগজ প্রতিবেদক ॥ ঈদুল আযহার ঈদের পরবর্তী সময়ে কুষ্টিয়ার চালের বাজারে দেখা দেওয়া অস্থিরতা কিছুটা কাটলেও স্বস্তি ফিরছে না সাধারণ মানুষের মধ্যে। অস্থির হয়ে পড়েছে বাজার, দিশেহারা সাধারণ মানুষ। ঈদ পরবর্তী সময়ে দেশের বৃহত্তম চালের বাজার কুষ্টিয়াতে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পর বর্তমানে বাজার স্থিতিশীল থাকলেও, নিত্যপণ্যের বাড়তি দরে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের আগে বাজারের দর তুলনামূলক কম থাকলেও দোকানপাট খোলার দু-তিন দিনের মাথায় চালের দাম বাড়ে। বর্তমানে সেই বাড়তি দামেই বেচাকেনা চলছে।
কুষ্টিয়া পৌর বাজারের মেসার্স মা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মাহমুদ মনজু জানান, বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ২৫ কেজির প্রতি বস্তা মিনিকেট ব্র্যান্ডের চাল ১৮০০ টাকা (কেজি ৭২ টাকা) এবং নন-ব্র্যান্ডের চাল ১৬০০ থেকে ১৬৫০ টাকার (কেজি ৬৪-৬৬ টাকা) মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কাজললতা ব্র্যান্ডের চালের বস্তা ১৬৫০ টাকা (কেজি ৬৬ টাকা) এবং নন-ব্র্যান্ডের বস্তা ১৫৫০ টাকায় (কেজি ৬২ টাকা) পাওয়া যাচ্ছে। আটাশ চালের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রতি কেজি ৫২ টাকা দরে বস্তা ১৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ঈদের আগে ৫০ টাকা কেজি বা ১২৫০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি হয়েছিল। পাশাপাশি, মোটা চাল প্রতি কেজি ৪৮ টাকা দরে এবং বাসমতি ব্র্যান্ডের চাল প্রতি কেজি ৮৮ টাকা (বস্তা ২২০০ টাকা) ও নন-ব্র্যান্ডের চাল ৮৪ টাকা (বস্তা ২১০০ টাকা) দরে বিক্রি হচ্ছে।
কুষ্টিয়া পৌর বাজারের বাঁধন স্টোরের মালিক মো. বাবুল বলেন, কুরবানির ঈদের পর থেকে কুষ্টিয়ার বাজারে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা করে বেড়েছে। তবে গত দুই সপ্তাহ আর দাম বাড়েনি। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আমদানির সংকট না থাকলে বাজারের এই স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। চালের মূল্য বৃদ্ধি ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সামির এগ্রোর মালিক ও দেশ এগ্রোর পরিচালক সামির খালেক বলেছেন, ঈদের আগের তুলনায় ঈদের পরে কুষ্টিয়ার বাজারে চালের দাম কেজিতে ১-২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে. মূলত ধানের দাম মানভেদে এবং জায়গাভেদে মণপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই চালের মূল্যের উপর এই প্রভাব পড়েছে।
কুষ্টিয়ার একটি বেসরকারি চাকুরী করেন শরিফুল ইসলাম তিনি বলেন, চাউলের দাম বেরে যাওয়ার কারনে অনেক সমস্যা পড়তে হয়। চালসহ সব কিছুর দাম বাড়ছে কিন্তু আমাদের বেতনতো বাড়েনি। এক কেজি চাউলের দাম যদি ৬২ টাকা হয় তাহলে মাসে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ শত টাকা এর ফলে চাল কিনতেই চলে যাচ্ছে অনেক টাকা। আমরা সাধারণ কর্মচারী বাচ্চার পড়াশোনাসহ নানা রকম খরচ আছে। যদি এতো টাকা করে চাল কিনে খেতে হয় তাহলে আমরা চলবো কি করে।
কুষ্টিয়া শহরের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক তুহিন শেখ বলেন, আমি অটো চালায় এখন শহরে অনেক অটো হয়ে গেছে এর ফলে যাত্রী কম হয়। আবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে চার্জের খরচও বেড়েছে। এর ফলে আয়ও কমেছে। এদিকে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে চালের দাম কদিন পর পরই বাড়ে নতুন করে আবার ২/৩ টাকা বেড়েছে কিন্তু তুলনামূলকভাবে আয় করতে পারছিনা। আমার চাই বাজারে পন্যের দাম স্বাভাবিক থাক এতে আমরা একটু বাঁচতে পারবো।
চালের মূল্য বৃদ্ধি ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সামির এগ্রোর মালিক ও দেশ এগ্রোর পরিচালক সামির খালেক বলেছেন, ঈদের আগের তুলনায় ঈদের পরে কুষ্টিয়ার বাজারে চালের দাম কেজিতে ১-২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে. মূলত ধানের দাম মানভেদে এবং জায়গাভেদে মণপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই চালের মূল্যের উপর এই প্রভাব পড়েছে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ বিল প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আমাদের উৎপাদন খরচও অনেকটা বেড়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে ধানের মূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম এবং পরিবহন খরচসহ সব ধরনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণেই মূলত চালের দাম বাড়াতে বাধ্য হতে হয়েছে। সরকারের ধান ও চাল সংগ্রহের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও মূল্য থাকে। কৃষকরা স্বাভাবিকভাবেই ভালো মূল্যে ধান বিক্রি করতে চান। সরকার যে মূল্যে বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করে, আমাদেরকেও ধানের বাজারের সেই প্রভাব মেনে নিয়ে তার কাছাকাছি দামেই ধান কিনতে হয়।
তবে সামির খালেক এসময় আশার কথা শুনিয়েছেন, সামনের দিনগুলোতে চালের দাম আর বাড়ার কোনো সম্ভাবনা বা প্রেক্ষাপট নেই। আগামী দুই-তিন মাস বাজার স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যারা নিয়মিত ব্যবসা করি, তারা সবসময় বাজার স্থিতিশীল থাকার পক্ষেই থাকি। কারণ বাজার অস্থিতিশীল হলে যারা হঠাত করে ব্যবসা করতে আসে বা তৃতীয় পক্ষ (মধ্যস্বত্বভোগী), তারা মজুদ করতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
বাজার স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল থাকলে আমাদের মতো নিয়মিত ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসা করা অনেক সুবিধাজনক হয়। বর্তমানে মার্কেটে ব্যাংকের ইন্টারেস্ট রেট (সুদের হার) অনেক বেশি। চালের দাম বেড়ে গেলে আমাদের বিনিয়োগও অনেক বেশি লাগে। তাই আমরা সবসময় চাই চালের দাম যেন সহনীয় থাকে; আমরা কম দামে কিনে যেন কম দামেই ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারি।
বর্তমানে চালের দাম বাড়ার কারণে ভোক্তাদের মাঝেও একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখনকার ভোক্তারা চাল কেনা ও খাওয়ার ব্যাপারে অনেক পরিমিত এবং হিসাব নিকাশ করে চলছেন। চালের দাম যদি স্বাভাবিক বা কম থাকত, তবে হয়তো ভোক্তাদের এই অতিরিক্ত হিসাব করে চলতে হতো না।
কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন জানিয়েছেন, হালে চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে মূলত ধানের আর্দ্রতা (কাঁচা ও শুকনা ধানের পার্থক্য) এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
বাজার পরিস্থিতি ও দাম বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে জয়নাল আবেদিন বলেন, ধান কাটার পরপরই যখন বাজার থেকে ধান কেনা হয়েছিল, তখন ধান ছিল কাঁচা। কাঁচা ধানের দাম স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কম থাকে। কিন্তু সেই ধান যখন শুকিয়ে পরিপক্ব ও শুকনা করা হয়, তখন ওজনে ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে ধানের দাম মণে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। ধানের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই চালের দামেও তার প্রভাব পড়ে।
তিনি আরও বলেন, সাধারণত কুরবানির ঈদের পর পরবর্তী দুই মাস বাজারে ধানের দাম এমনিতেই কিছুটা চড়া থাকে। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে চালকল বা মিলগুলোর উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে, যা বাজারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিদ্যুৎ ও ধানের দামের সমন্বয়ের কারণে বাজারে কিছুটা দাম বাড়লেও বর্তমানে চালের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে। আগামীতে বাজার আর বাড়ার সম্ভাবনা নেই। বাজার এখন যেভাবে আছে, এভাবেই স্থিতিশীল অবস্থায় চলতে থাকবে বলে আমরা আশা করছি।


