এনএনবি : রাজশাহী অঞ্চলে এখন আমের উৎসব। আর এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি, লাখো মানুষের জীবিকা এবং একটি বিস্তৃত বাণিজ্যিক চক্র। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর, এই চার জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, উৎপাদন, বিপণন, পরিবহন, প্যাকেজিং, কুরিয়ার, ব্যাংকিং, ঝুড়ি শিল্প ও রপ্তানি কার্যক্রম মিলিয়ে কয়েক মাসের এই মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকা- হতে পারে।
একসময় আম ছিল কেবল মৌসুমি ফল। কিন্তু গত দুই দশকে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্পে রূপ নিয়েছে। নতুন জাতের উদ্ভাবন, বাণিজ্যিক বাগানের সম্প্রসারণ, আধুনিক পরিচর্যা ও অনলাইন বাজার ব্যবস্থার কারণে আম এখন শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী জানান, ইতোমধ্যে দেশি গুটি, গোপালভোগ ও রানীপছন্দ প্রায় শেষ। বাজারে উঠেছে খিরসাপাত ও ল্যাংড়া। পর্যায়ক্রমে ফজলি, আম্রপালি ও আশ্বিনা বাজারে আসবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলনও ভালো হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ধান ও আলুর পর এখন আম উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিকল্পিতভাবে আমভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে পারলে সারা বছরই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে এবারও শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলার প্রায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন।
বিশেষ করে ফজলি, খিরসাপাত, ল্যাংড়া ও আশ্বিনা জাতের আমের জন্য দেশের অন্যতম পরিচিত অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জেলার কানসাট মোকাম মৌসুম এলেই দেশের বৃহত্তম আম বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়। প্রতিদিন এখানে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হচ্ছে, আর জেলাজুড়ে বেচাকেনার পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি। মৌসুমজুড়ে প্রায় দুই থেকে আড়াই মাসব্যাপী চলা এই আম বেচাকেনার বাজারে মোট লেনদেনের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং পুরো মৌসুমে জেলার আম ব্যবসার আকার সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়ে থাকে।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট আমের বাজারে বর্তমানে জাত ও মানভেদে আম ৮০০ টাকা থেকে ২,১০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। হিমসাগর (খিরসাপাত) ১,৭০০ টাকা থেকে শুরু করে ২,১০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। লক্ষণভোগ ও গুটি আম ১,০০০ থেকে ১,৪০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও কানসাটের আড়তগুলোতে ১ মণের বিপরীতে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৫৪ কেজিকে ১ মণ হিসেবে আম কেনাবেচা হয় বলে চাষিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নওগাঁ জেলার প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এ বছর প্রায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন আম উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে আম্রপালি ৭৬ শতাংশ, আশ্বিনা ৭ শতাংশ, বারি-৪ আম ৬ শতাংশ, ফজলি ৩ শতাংশ, ল্যাংড়া ৩ শতাংশ, ক্ষীরসাপাত ২ শতাংশ, গৌরমতি ১ শতাংশ, কাটিমন ১ শতাংশ এবং অন্য জাতের ১ শতাংশ জমিতে আমের বাগান রয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ১২ মেট্রিক টন। সে হিসেবে প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৩৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু নওগাঁতেই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে। গত বছর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১০০ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। এবার সেই পরিমাণ দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এবার বিশ্বের আটটি দেশে আম রপ্তানি হবে। দেশগুলো, যুক্তরাজ্য, ইতালি, সুইডেন, জার্মানি, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান। এসব দেশে ১০০ মেট্রিক টন আমের চাহিদা রয়েছে। গত বছর ১৫ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি হয়েছিল। বিগত বছরগুলোতে এই জেলা থেকে প্রতি মৌসুমে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হয়েছে। ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রায় ২০০ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ মৌসুমে ২২৫ মেট্রিক টন এবং ২০২৪-২৫ সালে ২২৭ মেট্রিক টন আম সরাসরি বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এবার এ জেলা থেকে ২৫০ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি হতে পারে বলে জানান তিনি। রাজশাহীতে এ বছর প্রায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্য প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টন। বাঘা উপজেলা জেলার সবচেয়ে বড় আম উৎপাদন এলাকা। এছাড়া চারঘাট, গোদাগাড়ী, পুঠিয়া, বাগমারা ও দুর্গাপুরেও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে আমচাষ।
রাজশাহীর বানেশ্বর ও বাঘা উপজেলার মোকামগুলোতে এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আম কেনাবেচা চলছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে অবস্থান করছেন এসব মোকামে। গোদাগাড়ীর চাষি আব্দুর রহিম সাগর ৫০ একর জমিতে আম চাষ করেছেন। এবার তিনি এক কোটি টাকার আম বিক্রির আশা করছেন। তিনি বলেন, ফলন ভালো হয়েছে। বাজারদর অনুকূলে থাকলে এবার লাভবান হওয়ার আশা করছি।
একজন আমচাষি বলেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভালো দাম পাব বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু বাজারে দাম নেই। নাটোরে চলতি মৌসুমে প্রায় ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬৮ হাজার টন। জেলার লালপুর, বাগাতিপাড়া ও আশপাশের এলাকায় দ্রুত বাড়ছে বাণিজ্যিক আমচাষ। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ বছর নাটোরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের মৌসুমকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিশাল মৌসুমি অর্থনীতি। বাগানের শ্রমিক, ঝুড়ি কারিগর, ট্রাকচালক, পরিবহন শ্রমিক, কুরিয়ার কর্মী, আড়তদার ও প্যাকেজিং কর্মী মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান। আম সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকিংয়ে নিয়োজিত শ্রমিকরা প্রতিদিন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। একইসঙ্গে ঝুড়ি ও প্যাকেজিং শিল্প, পরিবহন খাত এবং কুরিয়ার সেবার সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষও মৌসুমে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ পান। ফলে আম শুধু একটি ফল নয়, বরং এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে।


