বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
‘হুজুর বলছিলেন মনে কর তুমি স্বপ্ন দেখতেছ’ কুমারখালীতে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ জন্মজয়ন্তীতেও অবহেলিত গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কুষ্টিয়ার কাঙাল হরিনাথ মজুমদার দিল্লির রাজপথে ক্ষোভের সুনামি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘সীমা লঙ্ঘনে’ দিশেহারা মোদি সরকার কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের চেক বিতরণ করলেন প্রশাসক অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে কবে বিদায় নেবেন মেসি লেবুর উপকারিতা ও অপকারিতা বিএনপি বিপ্লবের সন্তান: রিজভী বিশ্ববাজারে কমলো তেলের দাম মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি স্মরণসভা শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যেতে হবে: জুবাইদা রহমান ‘আমাদের আরও ভালো হতে হবে’, প্রথম ভাষণে বললেন নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
সদ্যপ্রাপ্ত
‘হুজুর বলছিলেন মনে কর তুমি স্বপ্ন দেখতেছ’ কুমারখালীতে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ জন্মজয়ন্তীতেও অবহেলিত গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কুষ্টিয়ার কাঙাল হরিনাথ মজুমদার দিল্লির রাজপথে ক্ষোভের সুনামি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘সীমা লঙ্ঘনে’ দিশেহারা মোদি সরকার কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের চেক বিতরণ করলেন প্রশাসক অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে কবে বিদায় নেবেন মেসি লেবুর উপকারিতা ও অপকারিতা বিএনপি বিপ্লবের সন্তান: রিজভী বিশ্ববাজারে কমলো তেলের দাম মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি স্মরণসভা শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যেতে হবে: জুবাইদা রহমান ‘আমাদের আরও ভালো হতে হবে’, প্রথম ভাষণে বললেন নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরে স্বকীয়তা হারিয়েছে
/ ৭৩ দেখা হয়েছে
বার : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরে এসে স্বকীয়তা হারিয়েছে, প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিমালা ও উদ্দেশ্যে থেকে বিচ্যুত হয়েছে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়। মিশে গেছে দেশের আর দশটা সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সারিতে। ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে গঠিত ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি কমিটি’র (বারী কমিশন) প্রস্তাবিত মূল আদর্শ, পাঠ্যক্রম ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বিচ্যুত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষক ও শিক্ষাবিদরা। ক্রমাগত আদর্শিক বিচ্যুতি, রাজনৈতিক বলয় এবং ইসলামিয়াতবিহীন পাঠক্রমের কারণে একসময়ের ওআইসি পৃষ্ঠপোষকতার বৈশ্বিক সম্ভাবনা হারিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন আন্তজার্তিক র‌্যাংকিংয়েও জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
১৯৭৭ সালের ৩১ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল মক্কায় অনুষ্ঠিত ‘প্রথম বিশ্ব মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন’-এ মুসলিম বিশ্বে আধুনিক ও ইসলামি শিক্ষার সমন্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৭ সালের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ড. এম এ বারীকে চেয়ারম্যান করে ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি কমিটি’ গঠন করেন। কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন আহমেদ হুসাইন। সদস্য হিসেবে ছিলেন এ হাদী তালুকদার, এম এ মুক্তাদির, এখলাসউদ্দিন আহমেদ, এ কে এম আইয়ুব আলী ও মুহাম্মদ আবদুস সালাম।

 


‘কমিশনের প্রতিবেদনে আরবি ভাষা, ইসলামিয়াত, ইসলামি সংস্কৃতি ও ইতিহাসের পাশাপাশি প্রতিটি বিষয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন বাস্তবায়ন হয়নি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় কোর্সে বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের পরিবর্তে অন্যান্য শিক্ষকদের মাধ্যমে পরিচালনা করায় এর কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যও অর্জিত হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে তার স্বকীয় চরিত্র হারিয়ে একটি সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ ধারণ করেছে। ওআইসির নীতিগত নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও আদর্শিক বিচ্যুতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে মূল ধারা থেকে সরে যায়’
মদিনা, আল-আজহার এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় সফর করে বিশ্বমানের ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন কমিটির কয়েকজন সদস্য। ১৯৭৭ সালের ২৯ আগস্ট এই কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে ১৯৮০ সালে জাতীয় সংসদে বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন পাস হয়। তবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নির্দেশে ১৯৮২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির কাজ বন্ধ করে গাজীপুরের বোর্ড বাজারে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে গাজীপুরে বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক ব্লকেড ও আন্দোলনেকে কেন্দ্র করে সরকার ক্ষুব্ধ হয়ে আগের যায়গায় এটিকে ফিরিয়ে আনে।
মূল দর্শন থেকে বিচ্যুতি
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে রয়েছে মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের দিকনির্দেশনা। উপনিবেশবাদ ও ‘এডুকেশনাল জিহাদ’এর বিষয়ে প্রতিবেদনের ২.২ ও ২.৩.২ ধারায় আলোচনা করা হয়েছে। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার ফলে মুসলিমদের মনস্তত্বে যে অবক্ষয় এসেছে, তা মোকাবিলা করা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য। ২.১৮.৩ ধারায় ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যাবস্থার বিষয়ে সতর্ক করে সমাধান হিসেবে পশ্চিমা ভাবধারার পরিবর্তে এমন এক ইসলামি ভাবধারা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, যা ইহকাল-পরকালের মেলবন্ধন ঘটাবে।
প্রতিবেদনের ১.১ ধারায় সব বিভাগে ইসলামি শিক্ষার সমন্বয়ের বিষয়ে বলা হয়। ধারা ১.২.১ এবং ৫.১৪-তে ভর্তির ক্ষেত্রে জেনারেল ও মাদরাসা থেকে সমান সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর ৫০ শতাংশ মাদরাসা থেকে নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। দুই ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ১০০ নম্বরের ইংরেজি অথবা আরবি ও ইসলামিয়াতও আবশ্যিক ছিল। বর্তমানে শুধু আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগে ভর্তির নিয়ম অনুসরণ করা হলেও অন্যান্য বিভাগের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য বিলুপ্ত। এছাড়া ধর্মতত্ত্ব অনুষদেও নেই জেনারেল শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশের ভারসাম্য নীতি।
আধুনিক জ্ঞান ও ইসলামের মেলবন্ধনে ঘাটতি
৩.৪ ধারার আবশ্যিক শর্ত উপেক্ষা করে বর্তমানে প্রতিটি বিভাগে ইসলামিয়াতের অনুপস্থিতি দৃশ্যমান। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক শিক্ষা দেওয়া হলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সুযোগ ছিল না। ৩.৩ ধারায় পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক চিন্তাভাবনা মুক্ত করার পরামর্শও দেওয়া হয়।
‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে তার মূল দর্শনের আলোকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে’ উপাচার্য
প্রতিবেদনের ধারা ৫.৫ অনুযায়ী সব অনুষদের শিক্ষার্থীদেও প্রথম বর্ষে তিনটি ব্যাকগ্রাউন্ড কোর্স আরবি ভাষা, অন্য আরেকটি বিদেশি ভাষা এবং কুরআন-হাদিস-আকাইদ সম্বলিত ইসলামিয়াতে পাস করা বাধ্যতামূলক করা হয়। পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণদের বহিষ্কারের নিয়মও উল্লেখ হয় এতে। এছাড়া ধারা ৫.১৬ এবং ৩.৬ অনুযায়ী যেকোনো বিষয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ী ও পদোন্নতির জন্যও এই তিনটি বিষয় বেঁধে দেওয়া হয়।
কাগজেই বন্দি প্রস্তাবিত সব বিভাগ
৫.১.১ ধারা অনুযায়ী ধর্মতত্ত্ব অনুষদের অধীনে কুরআন-হাদিস-দাওয়াহ বিভাগ থাকলেও অধরা শরিয়াহ এবং তাসাউফ বিভাগ। সদ্য বিদায়ী প্রশাসন তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অনুষদ চালুর পরিকল্পনা নিলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন অনুমোদন দেয়নি।
ধারা ৫.১.২, ৫.১.৩ এবং ৫.৩ অনুযায়ী কলা অনুষদে অর্থনীতি ও মুসলিম অর্থনৈতিক তত্ত্ব এবং লোকপ্রশাসন ও মুসলিম প্রশাসন তত্ত্ব নামে বিভাগ চালুর প্রস্তাব থাকলেও তা করা হয়নি। বিগত শাসনামলে আইন ও শরিয়া অনুষদের নাম পরিবর্তন করে ‘শরিয়া’ শব্দটি তুলে দেওয়া হয়। ৫.৩ ধারার জিয়াউর রহমানের নীতি উপেক্ষা করে ঢালাওভাবে বিভিন্ন বিভাগ চালু করা হয়েছে, যা উদ্দেশ্যহীন ও প্রস্তাবিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংঘর্ষিক।
প্রতিবেদনের ৫.২০ ধারা অনুযায়ী সাধারণ স্কুল ও মাদরাসার সংমিশ্রণে পরিচালিত এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসম্পন্ন একটি ল্যাবরেটরি স্কুল-কাম-মাদরাসা তৈরির লক্ষ্য থাকলেও বর্তমানে এটি নামমাত্র সাধারণ হাই স্কুল।
এছাড়া ৫.২১ ধারায় বিশ্বমানের বই বাংলাসহ আন্তর্জাতিক ভাষায় অনুবাদের জন্য অনুবাদ, সংকলন ও প্রকাশনা ব্যুরো তৈরির নির্দেশনা থাকলেও তা নেই। ধারা ৫.২২-এ উল্লেখিত মধ্যপ্রাচ্যের ভাষা (আরবি, ফারসি, তুর্কি), ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে গবেষণার জন্য প্রস্তাবিত মিডল-ইস্ট স্টাডিজের ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। প্রতিবেদনের অষ্টম অধ্যায়ের প্রস্তাবিত মধ্যপ্রাচ্য মিউজিয়াম এবং শপিং সেন্টারের কাজও অন্ধকারে।
ইসলামি মূল্যবোধের অনুপস্থিতি
ওই প্রতিবেদনের ৫.২৭ ধারায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়। শুধু তাই নয়, মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও ইসলামি মূল্যবোধ ও ইসলামের মহান ব্যক্তিত্বদের অবমাননার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। তবে ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, নামে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হলেও অন্য সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই বিভিন্ন উপলক্ষে হচ্ছে এখানেও নাচ-গান ও কনসার্ট, যা প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ধারা ৫.২৭.৩-তে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় ও হাজিরা বাধ্যতামূলক করা হয়। জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর কয়েকবছর এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়। একইভাবে প্রতিবেদনের ৫.১৩ ধারায় স্বাধীনতা দিবসসহ অন্যান্য জাতীয় দিবসের পাশাপাশি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জন্মবার্ষিকী পালনের বিষয়ে উল্লেখ থাকলেও তা শুধুমাত্র কয়েকটি বিভাগে পালনের অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাকালীন নীতির ৫.২৫ ধারায় শিক্ষকদের ক্যাম্পাসে অবস্থানের পাশাপাশি প্রত্যেকের অধীনে সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবকত্বের বিধান থাকলেও বর্তমানে বেশিরভাগ শিক্ষকই ক্যাম্পাসে অবস্থান করেন না।
অন্যদিকে, ধারা ৫.২৯ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিকর ও ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান খাদ্যের মান ও গুণগত পুষ্টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশাপাশি প্রতিটি আবাসিক হল, অনুষদ ও বিভাগে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ার সুপারিশ করা হয় ৫.২৯.৩ ধারায়। কিন্তু এসব লাইব্রেরিতে প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বই, গবেষণা সামগ্রী ও আন্তর্জাতিক মানের জার্নাল না থাকায় গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা সহায়তা থেকে বঞ্চিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ৫.৩১ ধারায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য ড্রেস কোড নির্ধারণের সুপারিশ থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের মতে, ১৯৮৫ সালে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) শিক্ষার মানোন্নয়নে আটজন আন্তজার্তিক মানের শিক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেও তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতায় তা থমকে যায়। পরবর্তী সময়ে ক্রমাগত অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি ও প্রস্তাবিত ইসলামি লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ায় ওআইসি এ বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করে এবং সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করে দেয়।
ওআইসির পৃষ্ঠপোষকতায় একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কিউএস ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে ১০০১তম এবং মালয়েশিয়ার আন্তজার্তিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ৬০৩তম অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কোনো আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়েই জায়গা করে নিতে পারেনি।
ড. এম এ বারী কমিটির প্রস্তাবিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক অধ্যাপক ড. আ ব ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী।
তিনি বলেন, ‘কমিশনের প্রতিবেদনে আরবি ভাষা, ইসলামিয়াত, ইসলামি সংস্কৃতি ও ইতিহাসের পাশাপাশি প্রতিটি বিষয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন বাস্তবায়ন হয়নি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় কোর্সে বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের পরিবর্তে অন্যান্য শিক্ষকদের মাধ্যমে পরিচালনা করায় এর কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যও অর্জিত হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে তার স্বকীয় চরিত্র হারিয়ে একটি সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ ধারণ করেছে। ওআইসির নীতিগত নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও আদর্শিক বিচ্যুতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে মূল ধারা থেকে সরে যায়।’
ইসলামিয়াতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্বাতন্ত্র রক্ষায় শুধু ইসলামিক স্টাডিজ কোর্স চালু করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিটি বিভাগের পাঠ্যক্রমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োগভিত্তিক জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যেমন—ধর্মতত্ত্ব অনুষদে কোরআন-হাদিসের পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান ও আধুনিক তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব; সামাজিক বিজ্ঞানে ইসলামি অর্থনীতি, যাকাত-ওয়াকফ, ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তা ও ইবনে খালদুনের সামাজিক দর্শন; জীববিজ্ঞানে ইসলামি চিকিৎসানীতি ও পুষ্টিবিজ্ঞান; প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বার ইসলামি নৈতিকতা ও ডিজিটাল আমানতদারিতা; ব্যবসায় অনুষদে ইসলামি ব্যাংকিং, হালাল মার্কেটিং ও ব্যবসায়িক নৈতিকতা; গণিতে ফারায়েজভিত্তিক উত্তরাধিকার হিসাব ও মুসলিম গণিতবিদদের ধারণা; সাংবাদিকতায় সত্যতা যাচাই এবং আইন অনুষদে প্রচলিত আইনের পাশাপাশি ইসলামি বিচারব্যবস্থা অন্তভুর্ক্তি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষকের ভাষ্য, আল ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগ বাদে বেশিরভাগ বিভাগে ইসলামি জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো মৌলিক বা বিশেষায়িত কোর্স নেই। বিগত আওয়ামী আমলে প্রস্তাবিত বিভাগগুলো চালু না করে ইসলামি চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিভিন্ন বিভাগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে মৌলিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করতে গেলে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বিভাগীয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। অতীতে শিক্ষাক্রম থেকে মৌলিক ধর্মীয় কোর্স সংকুচিত করার প্রবণতা এবং অনেক ইসলামবিদ্বেষী ভাবাপন্ন জনবল নিয়োগের কারণে সংকট আরও গভীর হয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বৃদ্ধি এবং বারী কমিশনের মূল প্রতিবেদন পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও তার প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ও আন্তজার্তিক মর্যাদার পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৪ সালের রজত জয়ন্তীর এক বাণীতে তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষা ও ইসলামি শিক্ষার সমন্বয়সাধনের লক্ষ্যেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়টি স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে গৌরবময় ঐতিহ্য নির্মাণ করবে।’
একই বাণীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সঙ্গে ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশ ও জাতির নৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই জিয়াউর রহমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়টি স্বাতন্ত্র বজায় রেখে ভবিষ্যতে দেশকে সুনাগরিক উপহার দেবে।’
এ বিষয়ে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে তার মূল দর্শনের আলোকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।’

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ
ফেসবুক পেজ