কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা এলাকার সৈয়দ মাসউদ রুমী সেতু সংলগ্ন গড়াই নদীতে কোটি কোটি টাকার সরকারি ড্রেজিংকৃত বালু লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি অংশ এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চলে আসছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গড়াই নদীতে ড্রেজিং কার্যক্রমের মাধ্যমে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ বালু সেতুর পার্শ্ববর্তী লাহিনী, জয়নাবাদ ও লাহিনী মৌজায় সংরক্ষণ করা হয়। পরে ‘খাস কালেকশন’-এর মাধ্যমে এসব বালু বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, সরকারি তদারকির আড়ালে স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি চক্র এবং কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু সরিয়ে নিয়েছে। সরেজমিনে বালুর বর্তমান অবস্থা দেখতে গেলে সংবাদকর্মীদের পথরোধের চেষ্টা করে অভিযুক্ত চক্র। পরে ছবি না তোলার শর্তে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ মিললে গোপন ক্যামেরায় সরকারি বালু পাচারের চিত্র ধরা পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো বৈধ ইজারা বা অনুমতি ছাড়াই শত শত ড্রাম ট্রাকে করে দিন-রাত বালু সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আইন অনুযায়ী কোনো সেতুর ১কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সেতুর নিচ থেকে এবং আশপাশের ফসলি জমি ও রাস্তার ধার থেকেও অবাধে বালু কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সেতুর ভিত্তি দুর্বল হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গড়াই নদী ড্রেজিংয়ের পর সৈয়দ মাসউদ রুমী সেতুর পার্শ্ববর্তী জয়নাবাদ ও লাহিনী মৌজায় প্রায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮১৬ ঘনমিটার বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র আহ্বানের আগে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন কমিটির মাধ্যমে বালুর সঠিক পরিমাপ নির্ধারণ করার কথা থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, টেন্ডার সম্পন্ন হওয়ার আগেই অধিকাংশ বালু গায়েব হয়ে গেছে। এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে স্তূপ করা বালুই নেই, সেখানে ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার টেন্ডার হলেও সেটি এখনো কার্যকর হয়নি। অথচ কথিত খাস কালেকশনের নামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বালিসহ নদীর বালু হরিলুট হয়েছে। সেতু ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একদিকে জনগণের কাছ থেকে নিয়মিত টোল আদায় করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনের চোখের সামনেই কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ লুট হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া ৪ আসনের সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন বলেন, ও প্রসাশন আমাদের কথা শুনছে না, যারা আমাদের কথা শুনে পদক্ষেপ নিচ্ছে তাদের কে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে। অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমার ভূমিকা থাকবে জিরো টলারেন্স, আমি নিজেও চাই যাতে কোন প্রকার অবৈধভাবে বালু উত্তোলন না হয়, এই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমি জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলবো, সরকারের রাজস্ব যাতে ফাঁকিতে না পড়ে। আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় কঠোর নির্দেশ দিয়েছি। কোথাও কোনো অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি বা সরকারি সম্পদ লুট করতে দেওয়া হবে না। কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, জেলা পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। বিষয়টি তিনি ভালো বলতে পারবেন। এ বিষয়ে তৌহিদ বিন হাসান জানান, সৈয়দ মাসউদ রুমী সেতুর নিচে বালু চুরির অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে বালু লুটপাট বন্ধ করে জড়িত অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বালু খেকো চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যথায় কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী মহাসড়কের এই গুরুত্বপূর্ণ সেতু যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার মুখে পড়তে পারে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত বালু ব্যবসার প্রধান বিপুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে দাবি করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি নিয়েই বালু উত্তোলন করা হয়েছে। পরে তিনি বলেন, ১৩ এপ্রিলের পর থেকে আমি আর বালু উত্তোলন করি না। এখন জয় এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বালু তুলছে। তবে জয় এন্টারপ্রাইজ কার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনারা খোঁজ নিয়ে বের করেন। আর আপনি আমার সাথে দেখা করেন কথা বলি তাই বলে ফোনটি কেটে দেন।


