নাজমুল হুসাইন, ইবি প্রতিনিধি ॥ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) কেন্দ্রীয় গবেষণাগারে দৈনিক মজুরিতে কাজ না করেই এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নিয়মিত বেতন উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী মুবাশ্বির আমিন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র এবং শাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈবিছাআ) সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্বরত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ল্যাবের টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশে ‘অন-ক্যাম্পাস জব’-এর আওতায় বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক, গত বছরের আগস্ট মাসে ছয়জনকে দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরিতে কেন্দ্রীয় গবেষণাগারে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই তালিকায় শাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মুবাশ্বির আমিন অন্তর্ভুক্ত থাকলেও যোগদানের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিস্তর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, ল্যাবের পেশাদার দায়িত্ব পালনের চেয়ে দলীয় মিছিল, মিটিং ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই তিনি সিংহভাগ সময় ব্যয় করেন। অথচ ল্যাবে অনুপস্থিত থেকেও মাস শেষে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করে আসছেন তিনি। নথিপত্র অনুযায়ী, নিয়োগের পর থেকে গত আট মাসে তিনি মোট ৫২,০০০ টাকা উত্তোলন করেছেন। তার মাসিক বেতন উত্তোলনের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের আগস্টে ৩,২০০ টাকা, সেপ্টেম্বরে ৮,৪০০ টাকা, অক্টোবরে ৭,২০০ টাকা, নভেম্বরে ৮,৮০০ টাকা এবং ডিসেম্বরে ৬,৪০০ টাকা গ্রহণ করেন। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৭,২০০ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ৬,৪০০ টাকা এবং সর্বশেষ মার্চ মাসে ৪,৪০০ টাকা উত্তোলন করেছেন তিনি। ল্যাবে নিয়মিত উপস্থিত না হয়েও এভাবে সরকারি অর্থ গ্রহণ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক সহকর্মী অভিযোগ করে বলেন, “মুবাশ্বির ইইজি (ইইজি) এবং ইএসজি (ইএসজি) ল্যাবে দায়িত্বরত। সেখানে কাজের চাপ তুলনামূলক কম হলেও তিনি অন্যদের চেয়ে অনেক কম সময় দেন। তার হাজিরা খাতা দেখলে বুঝতে পারবেন, মাসে যারা কাজ করে তাদের মতোই তার হাজিরা থাকে। তবে সার্ভিস দেয় হয়তো মাসে ২/৩ দিন। দিনের অধিকাংশ সময়ই তাকে ল্যাবে পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র এসে স্বাক্ষর করে সে চলে যায়৷ এ বিষয়ে আমরা ল্যাব পরিচালকের কাছে মৌখিক অভিযোগও জানিয়েছি।” অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুবাশ্বির আমিন বলেন, “আমি মূলত বায়ো-ইনফরমেটিকস ল্যাবে কাজ করি। আমার ল্যাবে অন্যদের তুলনায় কাজের চাপ কিছুটা কম থাকে তবে কাজ না করার অভিযোগটি সত্য নয়। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ভিত্তিহীন। আমি নিয়মিতই ল্যাবে সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। এছাড়া ক্লাস বা পরীক্ষার সময় আমাদের কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে। মাঝে একবার ছুটি নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরে গিয়েছিলাম। এছাড়া বাকি সময় আমি নিয়মিতই দায়িত্ব পালন করছি। তবে এসময় তার ল্যাবে কাজ কম থাকার পরও কেন অন্যদের সমান বেতন উত্তোলন করেন জানতে চাইলে বলেন, তিনিও অন্যদের মতো উপস্থিত থাকেন। যার প্রমাণ হিসেবে তিনি হাজিরা খাতা দেখতে বলেন।” এদিকে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে ওই ল্যাবে কর্মরত আরেক দৈনিক মজুরি ভিত্তিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। তাকে একটি ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সুপারিশে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। অভিযুক্ত ওই কর্মচারীর নাম হাদি উজ্জামান। তাকে ল্যাবের ক্লিনার হিসেবে নিয়োগ দিলেও তিনি এসকল কাজ করেন না বরং ল্যাবে অনুপস্থিত থেকেই বেতন সুবিধা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের পরিচালক অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিগত আওয়ামী সময়ে ল্যাবটি একেবারে অব্যবহৃত অবস্থায় ছিলো। এখানে গবেষণার জন্য দামি দামি যন্ত্রাংশ রয়েছে। যা নিয়মিত তদারকি না করলে নষ্ট হয়ে যাবে। পরে এটি চালু করার জন্য বর্তমান উপাচার্যকে অনুরোধ করলে, তিনি কয়েকজন শিক্ষার্থীকে অস্থায়ীভাবে ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজের সুযোগ দিতে বলেন, যতদিন পর্যন্ত স্থায়ী নিয়োগ না দেওয়া হয়। সেই প্রেক্ষিতে কয়েকটি বিভাগ থেকে কয়েকজন এবং বাহির থেকে ২/১ জনকে অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এখানে যে কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে সেটি যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে বিধি মোতাবেক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যদি প্রমাণিত হয় তাহলে তাদের এই নিয়োগ বাতিল করা হবে। এদিকে এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আন্দোলনের মূল চেতনার পরিপন্থী।


