ওলি ইসলাম, ভেড়ামারা থেকে ॥ কুষ্টিয়া ভেড়ামারায় প্রবাসী সোহেল রানা হত্যাকান্ডের মূলরহস্য উদঘাটন করেছে থানা পুলিশ। বিজ্ঞ আদালতে আসামীরা দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেছেন। এই হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া ০৫ জন কে গ্রেফতার করেছে ভেড়ামারা থানা পুলিশ। কুষ্টিয়া ভেড়ামারা থানাধীন হরিপুর গ্রামের আবুল কালাম এর ছেলে নিহত সোহেল রানা (৪০) ইং-২৫/১১/২৫ খ্রিঃ তার ভাড়া বাসা হতে নিখোঁজ হয়। সোহেল রানা দীর্ঘ ১২ বছর যাবৎ জার্মান প্রবাসী ছিলেন। সে ১৪ বছর পর দেশে ফিরে তার পরিবারের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ায় ভেড়ামারা পৌরসভাধীন কোচস্ট্যান্ড সংলগ্ন ভাড়া বাসায় বসবাস করত। গত ইং-২৬/১১/২৫ তারিখ সকাল অনুমান ০৮.৩০ ঘটিকার সময় ভেড়ামারা থানাধীন রামচন্দ্রপুর গ্রামস্থ রামচন্দ্রপুর বিলের মাঠে জনৈক মৃত নিরাজ কাজী (সাং-ধরমপুর) এর মালিকানা জমিতে কৃষক মনিরুল মালিথা (৪৫), পিতা-ছাত্তার আলী মালিথা এর ধানক্ষেতে বিবস্ত্র অবস্থায় মুখমন্ডল পোড়া মৃতদেহ দেখা গিয়েছে মর্মে সংবাদ পাওয়া যায়। ভেড়ামারা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বিবস্ত্র গোপনাঙ্গের চামড়া ছেলা অবস্থায় মুখমণ্ডল পোড়া মৃতদেহ উদ্ধার পূর্বক সুরতহাল প্রস্তুত করেন। ভেড়ামারা থানা পুলিশ তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিকটিম সোহেল রানার পরিচয় উদঘাটন করিলে নিখোঁজ সোহেল রানার বড় ভাই ও বোন আরজিনা খাতুন থানায় এসে তারা উক্ত মৃতদেহ নিখোঁজ সোহেল রানার মৃতদেহ বলিয়া সনাক্ত করে। এ সংক্রান্তে ভেড়ামারা থানার মামলা নং-১৯, তারিখঃ ২৭/১১/২৫ খ্রিঃ, ধারা: ৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোড রুজু হয়। কুষ্টিয়া জেলার পুলিশ সুপার জনাব মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, পিপিএম (বার) মহোদয়ের সার্বিক দিক নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ভেড়ামারা সার্কেল মোঃ দেলোয়ার হোসেন এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম মামলার ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য গোপনে নিবিড়ভাবে তদন্ত শুরু করেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ভেড়ামারা সার্কেল মোঃ দেলোয়ার হোসেন সঙ্গীয় অফিসার ফোর্সসহ তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে ভেড়ামারা থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে নৃশংস হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত ০৫ (পাঁচ) জন আসামীকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা নৃশংস হত্যা কান্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা প্রদান করতঃ ০৩ (তিন) জন বিজ্ঞ আদালতে দোষ স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী প্রদান করে। তদন্তকালে জানা যায়, নিখোঁজ ভিকটিম সোহেল রানা জর্ডান প্রবাসী ছিল। মামলার ঘটনায় জড়িত আসামী সুজন ও ভিকটিম সোহেল পূর্ব পরিচিত। আসামী সুজন ভিকটিম সোহেলকে হত্যার আগের দিন অপর আসামী মহিন উদ্দিনকে ফোন দিয়ে তুষার, শাওন, জাবুল ও লিমনকে সাথে নিয়ে তার বাড়ীতে যেতে বলে। সকল আসামীগন সুজনের বাড়ীতে গেলে সুজন ঘরে বসে ভিকটিম সোহেল রানার ছবি দেখিয়ে তাকে মেরে ফেলার জন্য ৫০ হাজার টাকার চুক্তি করে। চুক্তি বাবদ সুজন মহিনের কাছে তৎক্ষনাত ২৫ হাজার টাকা দিয়ে বলে বাকি টাকা কাজের পরে দিব। ঘটনার দিন ইং- ২৫/১১/২০২৫ তারিখ সন্ধ্যার পরে ভিকটিম সোহেলকে আসামী মহিন সাতবাড়ীয়া বাজারে আসতে বলে। ভিকটিম সোহেল সাতবাড়ীয়া বাজারে আসলে লিমন ও মহিন ভিকটিম সোহেলকে সাতবাড়ীয়া বাজার থেকে মোটরসাইকেল যোগে ঘটনাস্থল রামচন্দ্রপুর গ্রামস্থ রামচন্দ্রপুর বিলের মাঠ -এর পাশে গ্রামের রাস্তায় নিয়ে আসে। আসামী মহিনের নির্দেশে ঘটনাস্থলে আগে থেকেই আসামী জাবুল ও তুষার হাসুয়া, বাঠাম, ২টি লোহার রড এবং ছুরি নিয়ে অবস্থান করছিল। মহিন, লিমন ও ভিকটিম সোহেল ঘটনাস্থলের পাশের রাস্তায় আসার পর সবাই একত্রে মিলিত হয়ে মাঠের দিকে হেটে যাওয়ার পথে ভিকটিম সোহেলের পিছনে অবস্থান নেওয়া আসামী মহিন ভিকটিমের মাথায় লোহার রড দিয়ে সজরে আঘাত করে। উক্ত আঘাতে ভিকটিম সোহেল মাটিতে পড়ে যায়। পরবর্তীতে আসামী তুষারের হাতে থাকা হাসুয়া দিয়ে ভিকটিম সোহেলের মাথার পিছনে কোপ মারে এবং অন্য আসামীরা এলোপাথারি মারপিট শুরু করে। প্রথমদিকে ভিকটিম সোহেল চিৎকার-চেচামেচি করলেও পরবর্তীতে তার মাথা থেকে প্রচুর পরিমানে রক্ত ক্ষরণ হওয়ায় এক সময় সে নিস্তেজ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আসামী মহিন সোহেলের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য ছুরি দিয়ে তার গলায় একাধিক আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। সোহেলের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আসামী তুষার ভিকটিমের পরনের পোশাক খুলে উলঙ্গ করে এবং উক্ত পোশাক একটি ব্যাগে ভরে পাশের ক্ষেতে ফেলে রাখে। যাহা থানা পুলিশ জব্দ তালিকা মূলে জব্দ করে। পরবর্তীতে সকল আসামীরা মিলে ভিকটিম সোহেলের মৃত দেহ রামচন্দ্রপুর গ্রামস্থ রামচন্দ্রপুর বিলের মাঠে ঘটনাস্থলে রেখে ধান গাছ দিয়ে গোপনাঙ্গসহ শরীর ঢেকে রেখে সকল আসামীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে আসামী মহিন এর বাড়ির কাছে ব্যাটমিন্টন কোটের পাশে মিলিত হয়। উক্ত স্থানে বসে মহিনের কাছে মার্ডার করা বাবদ থাকা টাকা সকলে ভাগ করে নেয়। পরবর্তীতে আসামী মহিন, যাবুল ও খোকন মোটরসাইকেল যোগে নতুন হাটে আসামী সুজনের সাথে দেখা করতে যায়। নতুন হাট যাওয়ার পথে ফারাকপুর মোড়ে পৌছালে মহিনের কাছে থাকা ভিকটিম সোহেলের কাছে থাকা মোবাইল ফোন ভেঙ্গে ফেলে রেখে যায়। যাহা উক্ত মামলার তদন্তের বিশেষ টিম উদ্ধার পূর্বক জব্দ করে। আসামী মহিন আসামী সুজনের সাথে দেখা করে পুনরায় আসামী মহিন এর বাড়ির কাছের ব্যাটমিন্টন কোটের পাশে এসে সকলকে যার যার বাড়িতে বলে। পরবর্তীতে আসামী মহিন অপর আসামী শাওনসহ পাটখড়ি ও পেট্রল নিয়ে ঘটনাস্থলে থাকা লাশের কাছে যায় এবং আসামী মহিন ও শাওন লাশের মুখে পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে মুখমন্ডল বিকৃত করে দেয়।


