কাগজ প্রতিবেদক ॥ হত্যার ঘটনার পর দীর্ঘ ৭ মাস অতিবাহিত হলেও এখনও হিস্টোপ্যাথলজির হিমঘরে আটকে আছে মায়া হত্যা রহস্য। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক ভূমিকায় দীর্ঘ ৯ মাস অপেক্ষা করে বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন ভিকটিমের পরিবার। পুলিশের করা ইউডি মামলা আর হত্যা মামলায় পরিনত হচ্ছে না। অপরাধীরা চলে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ৬ আগষ্ট সকালে কুষ্টিয়া বারো শরীফ দরবারের সামনে অঞ্জাত এক কিশোরীর লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্হানীয়রা। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা লাশটির চেহারা দেখে চেনার উপায় ছিল না। খবর পেয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এঘটনায় অপমৃত্যু মামলা নং ৩৬০ তারিখ ৬ আগস্ট ২০২৫ দায়ের করে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরন করে। পরবর্তী সময়ে মর্গে এসে লাশটি সনাক্ত করেন বৃদ্ধা নানী। কিশোরী মেয়েটির নাম মায়া খাতুন। বয়স ১৬ বছর।
আনজু বেগমের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০০৮ সালে তার মেয়ে শিরিনা খাতুনের সঙ্গে পাবনার আবুল কালামের বিয়ে হয়। বেশ কয়েক বছর সংসার করার পর মেয়ে জামাইয়ের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তখন মায়ার বয়স মাত্র ৯ বছর। এরপর মেয়ে জামাই উভয়ই অন্যত্র বিয়ে করে সংসার শুরু করে। মায়ার দায়িত্ব নেয়নি কেউই। বাধ্য হয়েই সে নানীর কাছেই থেকে যায়। লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক লাশের কপাল,গলাসহ বিভিন্ন স্হানে রক্তাক্ত জখমের কথা উল্লেখ করে ১০ আগষ্ট কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য মৃতের হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের নমুনা হিস্টোপ্যাথলজির জন্য প্রেরণের কথা উল্লেখ করা হয়। ১৮ আগস্ট সিভিল সার্জন অফিসে প্রতিবেদনটি নথিভুক্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার কাছে যায়। দীর্ঘ ৯ মাসেও হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্ট আসেনি। অপমৃত্যু মামলা আর হত্যা মামলায় পরিনত হয় নি। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল রবিবার কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খোঁজ নিয়েও হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টের দেখা মেলেনি। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ আবদুল মান্নান বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ময়নাতদন্ত করে ভিসেরা সংগ্রহ করেন। হিস্টোপ্যাাথলজির জন্য পাঠান।পুলিশ বাহিনী গুরুত্ব বিবেচনা করে পরবর্তী ব্যবস্হা গ্রহন করে থাকেন।
নিহত মায়া খাতুনের নানী আনজু বেগম বলেন,আমি অন্যের বাসা বাড়ীতে কাজ করে খাই। এ কারণে নাতিকে ঠিকমত দেখাশোনা করতে পারিনি। একপর্যায়ে ২০২৩ সালে কুষ্টিয়া কোট স্টেশন এলাকার চা বিক্রেতা সোহেল কর্তৃক যৌন নির্যাতনের শিকার হয় মায়া খাতুন। কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ এ ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেলকে আটক করে কোর্টে সোপর্দ করে। জামিনে বের হয়ে এসে সোহেল প্রায়ই মায়াকে উত্যক্ত করতো এবং হুমকি দিত। মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও হুমকি দিয়েছিল বলে জানান আনজু বেগম। সোহেলের বাড়ি থানাপাড়া গড়াই সেতুর নিচে। আনজু বেগম আরো জানান, মায়া নিহত হওয়ার রাতে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বাসা থেকে বের হয়।
অপর এক স্বজন রেবেকা খাতুন বলেন, কুষ্টিয়া কোট স্টেশন এলাকার কিছু মানুষের সাথে পরিচয় ছিল মায়ার। নেশার সাথে জড়িত ওই সমস্ত মানুষেরাও হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকতে পারে। তাদের জিঞ্জাসাবাদ করলে হত্যার ঘটনা সম্পর্কে তথ্য উদঘাটন করা যেতে পারে। তাদের মধ্যে অন্যতম কুষ্টিয়া কুটিপাড়া বড়ড্রেনের মোড়ের আনোয়ার। আনোয়ার কুটিপাড়ায় বোনের বাড়িতে বসবাস করলেও মোল্লাতেঘোরিয়া ক্যানাল পাড়ার নিজাম ডাকাতের পুত্র।
গতকাল মায়ার নানী আনজু বেগমের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আমি এঘটনার পর সন্দেহজনক হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলাম।স্টেশনে কানাঘুষা শুনেছি ল কলেজের ভেতর হত্যা করে ওখানে ফেলে গেছে সন্ত্রাসীরা। সে সময় ওসি সাহেব বলেছিলেন রিপোর্ট আসলে এমনিতেই মামলা হবে। এ ব্যাপারে বর্তমানে কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ কবির হোসেন মাতুব্বর জানান, ওই সময় যেহেতু আমি ছিলাম না। বর্তমানে ওই মামলার বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে পরে জানাতে পারবো বলে তিনি জানিয়েছেন।


