এনএনবি : দেশে দিনদিন বাড়ছে ভোজ্যতেলের চাহিদা। প্রয়োজনের তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় বাড়ছে আমদানি ব্যয়। আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারে নতুন তেলফসল ‘পেরিলা’। পেরিলা চাষের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের চাহিদাও অনেকটাই মেটানো সম্ভব।
বাংলাদেশ কৃষি তথ্য সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট ভোজ্যতেলের চাহিদা ৫১ দশমিক ২৭ লাখ মেট্রিক টন। যার মধ্যে ৪৬ দশমিক ২১ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করতে হয়। এর মূল্য ৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় ২৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। আমাদের দেশে তেলফসলের মধ্যে সরিষা, চীনাবাদাম, তিল, তিসি, সয়াবিন ও সূর্যমুখী প্রভৃতি চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে সরিষা, তিল এবং সূর্যমুখী থেকেই সাধারণত তেল বানানো হয়। বর্তমানে দেশে আবাদি জমির মাত্র ৪ ভাগ তেলফসলের আবাদ হয়। দেশে মোট ৪ দশমিক ৪৪ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়। যা থেকে ৬ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন সরিষা এবং সরিষা থেকে ২ দশমিক ৫০ লাখ টন তেল উৎপন্ন হয়। ভোজ্যতেলের এমন চাহিদা ও ঘাটতির মধ্যে সম্ভাবনাময় হাতছানি দিচ্ছে পেরিলা। পেরিলা চাষ করে বেশ ভালো লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে। পেরিলা ফসলের চাষাবাদ সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে অনেক কম মূল্যে পেরিলা তেল বাজারজাত করা সম্ভব। পেরিলা কী পেরিলা বাংলাদেশে অভিযোজিত একটি নতুন ভোজ্যতেল ফসল। এটির সরিষার মতোই দানাদার বীজ হয়। যা থেকে মাড়াই করে তেল পাওয়া যায়। মাড়াইয়ের পর ৪০ শতাংশ তেল পাওয়া যায়। যেখানে সরিষা থেকে পাওয়া যায় ৪০-৪২ শতাংশ তেল। পেরিলার উপকারিতা সায়েন্টিফিক বিশ্লেষণে পেরিলার পুষ্টি উপাদানের মধ্যে ৫১ শতাংশ ওমেগা-৩ পাওয়া গেছে। পেরিলায় থাকা ঔষধি উপাদান হার্টের জন্য খুবই উপকারী। এখানে প্রাপ্ত চর্বির ৯১ শতাংশ অসম্পৃক্ত, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া মস্তিষ্ক ও ত্বকের জন্যও উপকারী। তেল উৎপাদন ছাড়াও সবজি হিসেবে গোল্ডেন পেরিলার ব্যবহার আছে। বাইরের অনেক দেশে সবজি হিসেবে আছে পেরিলা পাতার আলাদা চাহিদা। তাছাড়া সুগন্ধযুক্ত হওয়ায় রান্নায় আলাদা স্বাদ আনতেও এটি ব্যবহার করা যায়। বিভিন্ন ফাস্ট ফুডেও আছে এর ব্যবহার। বাংলাদেশে পেরিলা সম্ভাবনা জানা গেছে, কোরিয়া থেকে আমদানি করা প্রতি লিটার ‘পেরিলা তেল’ বাংলাদেশের বাজারে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি পুষ্টিগুণের কারণে ধনী শ্রেণির মধ্যে এই তেলের বিশেষ চাহিদা আছে। কৃষক বর্ষা মৌসুমে ক্ষেতের আইলে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা যে কোনো উঁচু জায়গায় এটি চাষ করে তার পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় তেল সহজেই সংগ্রহ করতে পারেন। সেইসঙ্গে বাজারেও বিক্রি করতে পারেন। এ বীজে ২৫ শতাংশের বেশি আমিষ থাকে। ফলে এই তেল সংগ্রহের পর যে খইল পাওয়া যায়, তা যথেষ্ট প্রোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবেও উপাদেয়। দেশে পেরিলার যাত্রা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল গবেষক পেরিলা চাষ বিষয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেন। দীর্ঘদিন গবেষণা করে পেরিলাকে দেশীয় আবহাওয়ায় অভিযোজন করাতে সক্ষম হয়েছেন এ গবেষক দল। গবেষক দলটির মতে ‘সাউ-পেরিলা’ বাংলাদেশে উচ্চ ফলনশীল ও পুষ্টি সমৃদ্ধ আবহাওয়ায় অভিযোজন সম্পন্ন। কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচ এম এম তারিক হোসেনের তত্ত্বাবধানে ২০০৭ সাল থেকে এর ধারাবাহিক গবেষণা শুরু হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, জাতীয় বীজ বোর্ড সাউথ কোরিয়ান ভ্যারাইটির সাউ পেরিলা-১ (গোল্ডেন পেরিলা বিডি) নামে জাতটির নিবন্ধন দেয় এবং স্থানীয় কৃষকদের জন্য অবমুক্ত করা হয়। পেরিলা নিয়ে সরকারের ভাবনা ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক সাউ পেরিলা-১ (গোল্ডেন পেরিলা বিডি) নামে বাংলাদেশে প্রথম এর একটি জাত নিবন্ধিত হয়। জাতটি এখন মাঠ পর্যায়ে চাষ শুরু হয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, সাধারণ ভোজ্যতেলের চেয়ে বাড়তি পুষ্টিগুণ সম্পন্ন হাই ভ্যালু তৈল ফসল পেরিলার বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। এটি এখন বাংলাদেশের মাটিতে যে কেউ চাষ করতে পারেন। উচ্চমূল্যের তেলফসলটি অবমুক্তির পরই ১৪টি উপজেলায় (প্রতি উপজেলায় ১ বিঘা করে) পরীক্ষামূলক চাষ হয়। ২০২০ সালে প্রাথমিকভাবে দেশের ৪৫টি উপজেলার ১৭ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে পেরিলা চাষে উৎসাহ দেখিয়েছে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও। এরই মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাল তীরকে এর বীজ বিতরণ করা হয়েছে। সরকারের কৃষি বিভাগ আশা করছে, দেশে নতুন ভোজ্যতেল সাউ-পেরিলার চাষ সম্ভব। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন আসবে। পেরিলা চাষ পেরিলা চাষের আগে বেশ কিছু বিষয় অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। চাষের আগে সাউ পেরিলা-১ (গোল্ডেন পেরিলা বিডি) উৎপাদন প্রযুক্তি সম্পর্কে কিছু জানা প্রয়োজন। পানি জমে থাকে নাÑ এমন প্রায় সব ধরনের মাটিতে এ ফসল চাষের উপযোগী। তবে বেলে দোঁ-আশ বা দোঁ-আশ মাটি পেরিলা চাষের জন্য বেশি ভালো।


