এনএনবি : প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ৫ আগস্ট দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। জনগণের পক্ষ থেকে আমরা আমাদের স্বচ্ছ প্রস্তাবনা সেখানে জমা দিয়েছি। আমরা সবসময় বলি, আমরা যা করবো স্বচ্ছভাবে করবো, কোনো লুকোচুরি নেই। গণতন্ত্রে মতের পার্থক্য থাকবেই, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য দেশের মানুষের উন্নয়ন। সোমবার (২০ এপ্রিল) বিকেলে বগুড়ার ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা সফরে আসা তারেক রহমান বিকেল পৌনে ৬টায় স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে জনসভা মঞ্চে উপস্থিত হন। এই সফরেই তিনি বগুড়াকে দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন স্বৈরাচারের ভয়ে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল ‘সংস্কার’ এর ‘স’ শব্দটিও উচ্চারণ করার সাহস পায়নি, তখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি দিয়েছিল। কারণ আমরা দেখেছিলাম কীভাবে গত ১৬ বছরে দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মেগা প্রজেক্টের নামে কেবল লুটপাট আর দুর্নীতি করা হয়েছে। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি আপনাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে তার প্রত্যেকটি কাজ শুরু করেছি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানীর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এসব কাজ বাস্তবায়ন হলে দেশের খেটে খাওয়া মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে তারেক রহমান আরও বলেন, স্বল্প খরচে দেশের তরুণ সমাজের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে আমরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ, শিগগির আপনারা সুখবর পাবেন। এছাড়াও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিখ্যাত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ আমরা আবার দেশব্যাপী শুরু করবো। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে, যাতে কৃষকের ফসল রক্ষা পায় ও খরা মৌসুমে পানির অভাব না হয়। জুলাই সনদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিলেও ‘কিছু রাজনৈতিক দল’ জনগণকে বিভ্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, “আজ এই হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে, এই মিডিয়ার সামনে পরিষ্কারভাবে আমি আবারও বলে দিতে চাইÑ সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে জুলাই সনদে সই করে এসেছে, সেই জুলাই সনদের প্রত্যেকটি শব্দ, প্রত্যেকটি অক্ষর আমরা ইনশাল্লাহ এক এক করে বাস্তবায়ন করব। “কিন্তু বারবার পরিষ্কারভাবে এই কথা বলে দেওয়ার পরেও আমরা দেখলাম যে কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিছু কথাবার্তা তারা বলা শুরু করেছে।” তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি কমিশন করেছিল। ১১টি কমিশনের মধ্যে সংবিধান আছে, বিচারের বিষয় আছে, প্রশাসনিক আছে, স্বাস্থ্য আছে, নারী আছে। আজকে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি আমরা। “খেয়াল করে দেখবেন, যারা এই সংস্কার সংস্কার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, জুলাই সনদ সম্পর্কে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে; তারা কিন্তু নারীর স্বাধীনতা অথবা নারীর উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলে না। “তারা বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসার জন্য যে চিকিৎসা কমিশন করা হয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষ যাতে ওষুধ সহজে পেতে পারে, চিকিৎসা সহজে পেতে পারে—সেটির ব্যাপারে তারা কোনো কথা বলে না।
“কীভাবে প্রশাসনকে ঠিক করতে হবে সেটির কথা তারা বলে না, কীভাবে আইনশৃঙ্খলা ঠিক করতে হবে সেটির কথা তারা বলে না; তারা শুধু সংবিধান সংবিধান এই বিষয়ে কথা বলে।” প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “নির্বাচনের সময় আমি আপনাদের বলেছিলাম যে কীভাবে তারা বিভ্রান্ত করছে। এই গুপ্ত বিভ্রান্তকারীরা আবারও এই বিভ্রান্তের কাজ শুরু করেছে তারা। দুদিন আগের ঘটনা, এই গতকালকের ঘটনাÑ ময়মনসিংহের ওদিকে একটি জেলায় একটি ব্যক্তিগত তুচ্ছ ঘটনা ঘটেছে।
“এক ছেলে এক মেয়ের সাথে প্রেম করত, তারা বিয়ে-শাদি করেছে, তাদের পরিবারের সমস্যা; দেখেছেন আপনারা, ফেসবুকে দেখেননি? কিন্তু সাথে কি এটাও দেখেছেনÑ একটি পারিবারিক, একটি ব্যক্তিগত ঘটনাকে কারা রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দেশে অশান্তির সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, দেখেছেন আপনারা সবাই?” এর আগে সকালে ঢাকা থেকে সড়কপথে বগুড়ায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। দিনভর কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি জেলা জজ আদালতে নবনির্মিত ভবন ও ‘ই-বেইল বন্ড’ কার্যক্রমের উদ্বোধন, এরপর বহুল প্রতীক্ষিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের নামফলক উন্মোচন শেষে গাবতলীর বাগবাড়ীতে পৈতৃক ভিটা পরিদর্শন এবং শহীদ জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড ও খাল খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। সন্ধ্যায় বগুড়া প্রেস ক্লাবের নতুন ভবন উদ্বোধন শেষে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গজুড়ে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যায়। আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ ছাপিয়ে মানুষের ভিড় শহরের প্রধান সড়কগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।


