এনএনবি : দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করতে যাচ্ছে সরকার। এতে চলতি অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
সম্প্রতি সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় বাজেটের সামগ্রিক আকার ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চূড়ান্ত করা হয়। অনলাইনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভায় চলতি অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছর পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রক্ষেপণ নিয়ে আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ- প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব পড়ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। অথচ অতীত অভিজ্ঞতা বলছে- মাত্র একবার, ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল ছাড়া আর কোনোবারই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি এনবিআর। ওই বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি কর আদায় করতে পেরেছিল সংস্থাটি, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও পরে তা সংশোধন করে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ৪ লাখ কোটি টাকা আদায় নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজস্ব আয়ের এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণের চাপ। আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব আদায়কে মোট দেশজ উৎপাদনের ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবেই এনবিআরকে বড় ধরনের চাপের মুখে রাখা হয়েছে। এদিকে, উন্নয়ন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হতে পারে ৩ লাখ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা ও সংশোধিত এডিপির তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। নতুন এডিপির অর্থায়নের ক্ষেত্রে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হতে পারে। আয়-ব্যয়ের এই কাঠামোর ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৯ হাজার কোটি টাকা ও সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রায় আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি এখনও চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ শতাংশ। আগামী বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার নির্ধারণ করা হতে পারে ৬৮ লাখ ৩১৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই আকার প্রথমে ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা ধরা হলেও পরে সংশোধন করে ৬১ লাখ ২১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা করা হয়।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলে বাজেটের কাঠামো চূড়ান্ত হলেও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেটের বিভিন্ন খাতে সংশোধন আনতে পারে। আপাতত বিদ্যমান কাঠামোর ভিত্তিতেই মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর বরাদ্দ নির্ধারণের কাজ চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, আগামী বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সরাসরি সহায়ক প্রকল্পগুলোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। দুর্নীতি, অপচয় ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে স্বাস্থ্য খাতে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। চিকিৎসা সেবার মানও অনেক ক্ষেত্রে নি¤œমুখী। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এই খাতে বরাদ্দ কম হওয়াও উদ্বেগের বিষয়- বলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন হলেও দেশে তা ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর এক কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ী মহলের মতে, বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক সম্ভাবনাময় শিল্প অর্থসংকটে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, উচ্চ সুদের হার এবং অর্থায়ন সংকট ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সব কিছু বিবেচনায় নিয়েই বাজেট প্রস্তুতের কাজ চলছে।


