এনএনবি : একমাসের বেশি সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া দুঃসাহসী ইরান আর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হল ট্রাম্পের ‘পুরো সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার’ হুমকি কার্যকরে বেঁধে দেওয়া সময়সীমার দেড় ঘণ্টা আগে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি তার আলোচকদের যুদ্ধবিরতি নিয়ে সমঝোতার পথে এগিয়ে যেতে বলেন, বলা হয়েছে অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে। মুজতাবা খামেনির বাবা, ইরানের আগের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বোমা হামলার শুরুতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল স্বাভাবিক থাকবে। বিশ্বের তেল-গ্যাসের এক পঞ্চমাংশই এ সঙ্কীর্ণ জলসীমা দিয়ে গন্তব্যে যায়। “ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়েই হরমুজে নৌচলাচল সম্ভব,” এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট ইরান যুদ্ধে দুই সপ্তাহের বিরতির প্রশংসা করে একে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিজয়’ আখ্যা দিয়েছেন। “আমাদের সামরিক সাফল্য যে চরম সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছে, তা-ই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দলকে কঠিন আলোচনায় জড়িত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যার দরুন এখন কূটনৈতিক সমাধান ও টেকসই শান্তির পথ খুলেছে,” বলেছেন তিনি। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে রাখা সঙ্কটের ইতি ঘটবে এই আশায় যুদ্ধবিরতির খবরে বিশ্বের শেয়ার বাজারগুলোতেও ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। পর্দার আড়ালে ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালানোর হুমকি দিচ্ছিলেন, সেসময়ও পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন বাহিনী এবং পেন্টাগনের কর্মকর্তারা শেষ সময়েও ইরানি সামরিক-বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক বোমাবর্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং ট্রাম্প কোনদিকে ঝুঁকছেন তা বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র দেশগুলো প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইরানের দিক ব্যাপক পাল্টা হামলার।
সোমবার ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসে ইস্টারের অনুষ্ঠানে জনতার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন, সেসময় ‘খুবই ক্রুদ্ধ’ স্টিভ উইটকফ ব্যস্ত ছিলেন ফোনে, বলছে অ্যাক্সিওস।
ইরান থেকে পাঠানো, ওয়াশিংটনের হাতে সেসময় সদ্য যাওয়া ১০ দফার পাল্টা প্রস্তাবটি যে ‘অকার্যকর, অগ্রহণযোগ্য’—মধ্যস্থতাকারীদের তাই বলছিলেন মার্কিন এ বিশেষ দূত, বলেছে মার্কিন সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটটি। এরপর একের পর এক সংশোধনীর ‘অরাজক’ দিন অতিবাহিত হয়। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা উইটকফ ও ইরানি মন্ত্রী আব্বাস আরাকচির কাছে নতুন নতুন খসড়া পাঠাতে থাকেন, তুরস্ক আর মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মতপার্থক্য দূরে সহায়তার চেষ্টা করেন।
মধ্যস্থতাকারীরা সোমবার রাতের শেষভাগে দুই সপ্তাহ যুদ্ধবিরতির একটি সংশোধিত প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি আদায়ে সক্ষম হন। এরপর সিদ্ধান্তের ভার যায় খামেনির কাছে, যিনি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেননি। সোম ও মঙ্গলবারের প্রক্রিয়ায় খামেনি ব্যাপক সক্রিয় ছিলেন বলেও জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।
ইসরায়েলিরা সুযোগ পেলেই মেরে ফেলবে, এমন হুমকি মাথায় নিয়ে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হওয়া মুজতাবা খামেনি বেশিরভাগ সময় বার্তাবাহকদের মাধ্যমে নোট আদান-প্রদান করেই যোগাযোগ করে আসছেন, বলেছে ভার্জিনিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি। সমঝোতায় উপনীত হতে আলোচকদের প্রতি খামেনির আশীর্বাদই ছিল ‘ব্রেক থ্রু’, অনামা দুই সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি একদিকে আলোচনা সামলেছেন, অন্যদিকে রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডারদের যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে চেষ্টা করেছেন। চীনও ইরানকে ‘সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজার পরামর্শ’ দিচ্ছিল, বলছে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন। সে যাই হোক, লাগাম ছিল খামেনির হাতেই। দুই দিন ধরে চলা তীব্র আলোচনায় যত বড় বড় সিদ্ধান্ত হয়েছে তার সবই তার হাত ঘুরে হয়েছে বলে দাবি মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির। এক আঞ্চলিক সূত্র তাদেরকে বলেছে, “তার (মুজতাবা খামেনি) সবুজ সঙ্কেত ছাড়া কোনো সমঝোতাই হত না।” দুই পক্ষের মধ্যে অগ্রগতির বিষয়টি মঙ্গলবার সকালে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া যায়। তারপরও ট্রাম্প তার নৃশংস হুমকি না দিয়ে ছাড়েননি। “আস্ত এক সভ্যতা আজ রাতে মরে যাবে,” বলেছিলেন তিনি। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান আলোচনা ভেঙে দিচ্ছে বলে একাধিক মার্কিন গণমাধ্যমে পরষ্পরবিরোধী খবরও আসে। তবে ঘটনা এমন নয় বলে আলোচনায় যুক্ত একাধিক সূত্র অ্যাক্সিওসকে জানায়। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরি থেকে ফোনে যোগাযোগ রাখছিলেন, তিনি মূলত পাকিস্তানের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। মঙ্গলবার সারাদিন ট্রাম্প ও তার দলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের মধ্যে ছিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও; যদিও পুরো প্রক্রিয়াটি হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে ইসরায়েলিরা ক্রমশ উদ্বিগ্নও হয়ে উঠেছিল। মঙ্গলবার দুপুরের মধ্যেই যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো যাচ্ছে বলে একটি সাধারণ ঐকমত্য তৈরি হয়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক্সে যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো তুলে ধরেন এবং উভয় পক্ষকে তা মেনে নিতে অনুরোধ জানান। ট্রাম্প তাতে সম্মতি দেন। “আমি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে হামলা ও বোমাবর্ষণ স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছি,” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে বলেন ট্রাম্প। এরপর তিনি যুদ্ধবিরতি চূড়ান্তে পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলেন। শেহবাজ শরিফ এক্সে দেওয়া পোস্টে ইরানি ও মার্কিন প্রতিনিধি দলকে শুক্রবার ইসলামাবাদে মিলিত হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। ট্রাম্পের পোস্টের ১৫ মিনিট পর মার্কিন বাহিনীও হামলা বন্ধের নির্দেশ পেয়ে যায়। এরপর আরাকচি জানান, ইরান যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে। তাতে সাড়ে পাঁচ সপ্তাহ পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল বিশ্ব।


