আব্দুস সামাদ, মাসুদ, লিটন, জসিমসহ ১০-১২ জনের গংদের জবরদখল
কাগজ প্রতিবেদক ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন ময়নাগাড়ী রেলগেট এলাকায় রেলওয়ের প্রায় ১২ একর মূল্যবান জলাশয় অবৈধভাবে দখল করে বালু ভরাটের মহোৎসব চলছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও প্রভাবশালী একটি চক্র এই কাজ অব্যাহত রাখায় আইনগত ব্যবস্থা নিতে মিরপুর সিভিল জজ আদালতে মামলা দায়ের করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, পোড়াদহ রেলওয়ে স্টেশনের পার্শ্ববর্তী ময়নাগাড়ী রেলগেট এলাকায় রেলওয়ের মালিকানাধীন প্রায় ১২.৪২ একর জলাশয় ও নিচু জমি রয়েছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই সরকারি জমিটি বালু দিয়ে ভরাট করে দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি শাখা থেকে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে তা কার্যকর হয়নি। সিএস খতিয়ানভুক্ত ১২.৪২ একর জমির মধ্যে ১১.২৭ একর জমি নিয়ে বর্তমানে বিরোধ চলছে। অভিযোগ উঠেছে যে, স্থানীয় আব্দুস সামাদ, মাসুদ, লিটন, জসিমসহ ১০-১২ জন রেলওয়ের অনুমতি ছাড়াই জলাশয়টি বালু দিয়ে ভরাট করছে। সম্প্রতি কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের নির্দেশক্রমে মিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার(ভূমি) ঈশিতা আক্তার রেলওয়ের প্রায় ১২ একর মূল্যবান জলাশয় অবৈধভাবে দখল করে বালু ভরাটের জায়গা পরিদর্শন করেন। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নিতে গেলে তিনি কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি এবং ক্যামেরার সামনে আসতে পারবেন না বলে জানান। জমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার বাদী হয়ে মিরপুর সিভিল জজ আদালতে একটি স্বত্ব প্রচারের মামলা (দেওয়ানি মামলা) দায়ের করেছেন। মামলায় মো. আব্দুস সালাম সুজন ও হাজী মো. আব্দুস সাত্তারসহ ১৭ জনকে বিবাদী করা হয়েছে। মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিবাদীরা ভুয়া ও ত্র“টিপূর্ণ রেকর্ডের অজুহাতে রেলওয়ের শতবর্ষী মালিকানা অস্বীকার করে জমিটি দখলের চেষ্টা করছে। নালিশি জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ লক্ষ টাকা (দাপ্তরিক হিসেবে) দেখানো হলেও বাস্তবে এর মূল্য অনেক বেশি। এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুস সামাদ ও সুলতান সালেহিন মামুন বলেন, ক্রয় সূত্রে আমরা এই জমির মালিক। আমরা দখলে আছি। আমরা মালিকানাধীন জমি কিনেছি। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তবে এ জায়গা কিনতে না পারায় স্থানীয় ইকবাল শেখ এসব করাচ্ছেন এবং আমাদের কাছে সে বড় আকারের চাঁদা দাবি করেছে। অন্যদিকে তাদের এই অভিযোগের সততা উড়িয়ে দিয়ে ইকবাল শেঠ বলেন, আমি কারো কাছে চাঁদা দাবি করি নাই। তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছে। ওরা মূলত ভূমিদস্যু। তারা ভুয়া দলিল করে রেলের জলাশয় ভরাট করে চলেছে। এই ভূমিদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই জলাশয়টি ভরাট করার ফলে স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, এখানে জলাশয় ছিল। আমরা গোসল সহ নানা কাজ করতাম এখানে। কিন্তু কতিপয় লোক জায়গাটি দখল করে রাতদিন বালি ভরাট করছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রেলওয়ে (পশ্চিম) অঞ্চল, রাজশাহীর বর্তমান মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ মুঠোফোনে জানান, “আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছি। ইতোমধ্যে ওই এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে এবং লাল পতাকা টাঙিয়ে সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছে। তবে রেকর্ড সংক্রান্ত কিছু জটিলতা থাকায় উদ্ধার অভিযান কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে।” তিনি আরও জানান যে, অভিযুক্তরা ব্যক্তিগত নামে মিথ্যা রেকর্ড তৈরি করে জমির মালিকানা দাবি করছে। এই রেকর্ড সংশোধনের জন্য এডিসি (রেভিনিউ) আদালতে মামলা করা হয়েছে এবং দ্রুত ‘ইনজাংশন’ বা নিষেধাজ্ঞা জারির প্রক্রিয়া চলছে। বালি ভরাটের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা বাংলাদেশ রেলওয়ে পাকশিকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় ভূ- সম্পত্তি কর্মকর্তা বাংলাদেশ রেলওয়ে পাকশি’র শফিকুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি এসব বিষয় এড়িয়ে যান এবং অফিসে যেতে বলেন। এছাড়া তিনি উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। এদিকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, জমিটি ১৯২১-২২ সাল থেকেই রেলওয়ের দখলে ছিল। কিন্তু বর্তমানে কিছু অসাধু ব্যক্তি ভূয়া স্বত্বের দাবি তুলে গত ১৭ নভেম্বর থেকে প্রকাশ্যে দখলদারিত্ব শুরু করেছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রয়োজনে ভরাটকৃত বালু নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হবে এবং সরকারি সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা হবে। এর মধ্যে চলতি বছরের গত ২৯ মার্চ বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি শাখা থেকে একটি জরুরি তাগিদ পত্র ইস্যু করা হয়েছে। রেলওয়ের উপ-পরিচালক (ভূ-সম্পত্তি) মো. আবরার হোসেন স্বাক্ষরিত ওই পত্রে বলা হয়েছে- ‘পোড়াদহ এলাকায় রেলওয়ের জলাশয় বালু দিয়ে ভরাট করার দায়ে অভিযুক্ত অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে, বালু ভরাটের কাজ এখনো অব্যাহত আছে।’ পত্রে অবিলম্বে স্থানীয় থানার সহায়তা নিয়ে বালু ভরাটের কাজ বন্ধ করতে এবং রেলওয়ের মালিকানা ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পাকশী ও রাজশাহীর বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ের পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও থানাকে আইনগত সহায়তার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মামলার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও বালু ভরাট কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সরকারি সম্পত্তি এভাবে বেদখল হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, সিএস, এসএ এবং আরএস খতিয়ানে এই জমির মালিকানা রেলওয়ের নামে সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ভুলবশত কেউ নিজেদের নামে রেকর্ড করালেও তা আইনিভাবে টিকবে না এবং খুব শীঘ্রই বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই জলাশয়টি দখলমুক্ত করা হবে।


