এনএনবি : ইরান যুদ্ধের দুই সপ্তাহের মাথায় গেল ১৬ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সম্ভাব্য সমস্যাসমূহ পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে আছে। সেদিন তিনি বলেন, “হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল হুমকি তৈরি করবে, ইরানের সেই সক্ষমতা আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। তাদের ৩০টির বেশি মাইন বসানোর জাহাজ ধ্বংস করেছি। আমাদের জানা মতে, তাদের সব মাইন বসানোর জাহাজেই আমরা আঘাত হেনেছি।” ট্রাম্পের এই আশ্বাসের সপ্তাহ দুয়েক পর গত ৩১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালনপ্রতি (৩.৭৮ লিটার) জ্বালানি তেলের গড় মূল্য ৪ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২২ সালের কোভিড মহামারী পরবর্তী ধাক্কার পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি পণ্যের দাম এটাই সর্বোচ্চ। বিশ্বে যে পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনাবেচা হয়, তার প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
ট্রাম্প বলে বেড়াচ্ছেন, হরমুজ প্রণালি আংশিক বন্ধ থাকাটা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু বিশ্ব বাজার ট্রাম্পের সঙ্গে একমত নয়। প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কীভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে এতবড় ভুল করলেন? এর উত্তর হিসেবে দ্য আটলান্টিকের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকানরা যে একটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশ, এই সত্য ট্রাম্প অস্বীকার করেছেন। গত ১৬ মার্চের বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, “আপনার জানেন, হরমুজ প্রণালি থেকে আমাদের এখানে ১ শতাংশেরও কম তেল আসে। কিছু দেশ অনেক বেশি নেয়। জাপান নেয় ৯৫ শতাংশ; চীন নেয় ৯০ শতাংশ। ইউরোপের অনক দেশও প্রচুর তেল নেয়।”
কিন্তু ট্রাম্পের এই তথ্যে গড়মিল আছে। পারস্য উপসাগর থেকে চীন প্রায় ৪০ শতাংশ তেল কেনে। তবে ট্রাম্পের মূল বক্তব্যটি সঠিক, অর্থাৎ, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের মূল গন্তব্য এশিয়া। উত্তর আমেরিকায় খুব সামান্য তেলই যায়। কিন্তু ট্রাম্প যেটা বোঝেন না, সেটা হলো, তার এই ভৌগোলিক হিসাব জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। দ্য আটলান্টিক লিখেছে, ট্রাম্প এমন একটি মার্কিন অর্থনীতি কল্পনা করেন, যেখানে বিশ্বের বাকি অংশের কোনো প্রভাব পড়বে না। এজন্যই তিনি শুল্ক এত পছন্দ করেন; এজন্যই তিনি ভাবতে চান না যে, এই শুল্কের প্রভাব মার্কিন উৎপাদকদের ওপর কীভাবে পড়ে। কিন্তু জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে এমন প্রাচীর তোলা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত অধিকাংশ তেল ও গ্যাস দেশেই উৎপাদিত হয়। আমদানি যতটুকু হয়, বেশির ভাগই আসে কানাডা ও মেক্সিকো থেকে। কিন্তু ট্রাম্প জানেন না যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে দাম বেড়ে গেলে আমেরিকান তেল ট্যাঙ্কারে ভরে জাপান বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে পাঠানো যায়। দ্য আটলান্টিক লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে যদি সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখতে হয়, তাহলে তাদেরকে তেল রপ্তানি ও আমদানি দুটোই বন্ধ করে দিতে হবে।
কিন্তু ট্রাম্প তা করতে চান না। বরং তিনি বারবার অন্য দেশগুলোকে আরো বেশি মার্কিন তেল ও গ্যাস কেনার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন। গত ৩১ মার্চের বক্তব্যে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনুন; আমাদের প্রচুর আছে।” আটলান্টিক লিখেছে, হরমুজ প্রণালির জ্বালানি সরবরাহ মার্কিন গাড়িচালকদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বুঝতে না পারার অক্ষমতাই হয়ত ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে জড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে হামলার পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় হুমকি সম্ভবত হরমুজ প্রণালি। এটি এতটাই জটিল যে, গত প্রায় ৫০ বছরে ইরান উসকানিমূলক আচরণ করলেও কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেখানে সরাসরি হামলা থেকে বিরত থেকেছেন। এর মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে বোমা ফেলার কয়েক ঘণ্টা পর জাতির উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, “আজ রাতে আমি যা করছি, তা করার সাহস অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের ছিল না।” কিন্তু কেন ট্রাম্প সেখানে যুদ্ধে জড়ালেন, যা তার কোনো পূর্বসূরি করতে রাজি হননি? দ্য আটলান্টিক লিখেছে, হয়তো তিনি প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি এই যুদ্ধকে সমাধান হিসেবে দেখেছিলেন; হয়ত তিনি প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি মূল সমস্যাটাই বুঝতে পারেননি।


