এনএনবি : রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে বৈদেশিক ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, শুধু ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরÑ এ তিন মাসেই বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। এর আগে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের মোট ঋণ ছিল ১০৩ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় দেড় বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ঋণ বৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে উন্নয়ন ব্যয়, বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনা, ডলার সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারি খাতেই সবচেয়ে বেশি ঋণ বৃদ্ধি
ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে সরকারি খাত থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারিÑ উভয় খাতেই বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে। সরকারি খাতে সেপ্টেম্বরের ৯২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ঋণ বেড়ে ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে একই সময়ে ১৯ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ঋণ বেড়ে ২০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। ফলে মোট ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে সরকারি খাত থেকে, যা মূলত উন্নয়ন ব্যয় ও বাজেট ঘাটতি সামাল দিতেই বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। কেন বাড়ছে বৈদেশিক ঋণ গত এক দশকে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্প। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ঋণ নেওয়ার ধারা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বাজেট ঘাটতি পূরণ, সরকারি বেতন-ভাতা পরিশোধ ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা— এসব কারণে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ নেওয়া হয়েছে। ডলার সংকটের প্রভাব রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়ে ওঠে, যার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে। এতে—আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ডলারের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। টাকার বিপরীতে ডলার ৮৫ থেকে প্রায় ১২২ টাকায় ওঠে। ফলে রিজার্ভে চাপ তৈরি হয় এবং অর্থনীতি সচল রাখতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক সহায়তা বাড়ায় পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে।, অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক অর্থায়ন প্রয়োজন হলেও ঋণের ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদরা তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সেগুলো হলো-ঋণের কার্যকর ও উৎপাদনশীল ব্যবহার, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়ানো এবং নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন। সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বৈদেশিক ঋণ তাৎক্ষণিকভাবে সংকটজনক না হলেও, এর সঠিক ব্যবস্থাপনাই নির্ধারণ করবেÑ এটি ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য বোঝা হবে, নাকি উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।


