এনএনবি : ভারতে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিভিন্ন জরিপে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে থাকলেও ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বেশ কয়েকটি নির্বাচনী আসনে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখায় ভোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তৃণমূলের জনভিত্তি অটুট থাকলেও, দুর্নীতি ও উন্নয়নের বিষয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মতো দলগুলো কড়া টক্কর দিচ্ছে। মাতৃজ-আইএএনএস জনমত জরিপে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্বিতা হওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোটের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। জরিপের ফল বলছে, স্পষ্টতই মমতার ক্ষমতাসীন দল ভোটে এগিয়ে থাকবে। তবে বিজেপি তাদের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে থাকবে। সেকারণে পশ্চিমবঙ্গে আগেরবারের নির্বাচনগুলোর চেয়ে এবারের নির্বাচনে লড়াইটা অনেকটা কঠিন হবে বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও। পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চতুর্থ বারের জন্য ভোটে জিতলে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী নারী মুখ্যমন্ত্রীর তকমা ছিনিয়ে ইতিহাস গড়বেন। এর আগে রাজধানী দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত টানা ১৫ বছর ২৫ দিন মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসে দীর্ঘ মেয়াদী নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে রেকর্ড গড়েছিলেন। সেই রেকর্ডও এবার মমতা ভেঙে দেবেন কিনা প্রশ্ন সেটি।
বর্তমানে তৃতীয় মেয়াদে মুখ্যমন্ত্রী পদে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১১ সালে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। এরপর টানা তিনটি নির্বাচনে জয় পেয়ে রাজ্যে নিজ আধিপত্য ধরে রেখেছেন মমতা।
বিজেপি-র উত্থান এবং ‘মোদী সুনামি’কে রুখে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের দুর্গ ধরে রেখেছে তৃণমূল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোট। তবে সেই ভোটের প্রায় ৩০ শতাংশই ছিল মুসলিম ভোট। অর্থাৎ ৭০ শতাংশ হিন্দু ভোটের মধ্যে মমতার প্রাপ্তি ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ। সেই নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত ৭৭টি আসনে আটকে যায়। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠন করে, যদিও আসনসংখ্যা আগের তুলনায় কমে যায়। এবারের নির্বাচনে সেই অঙ্কই মমতার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবিরের আলাদা দল গঠন এবং অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল-মুসলিমিন (এআইএমআইএম) এর সঙ্গে জোট মুসলিম ভোটে বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি করেছে। হুমায়ুন কবীরের মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ তৈরির মতো সিদ্ধান্ত এই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে। মুসলিম তোষণের অভিযোগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লাগাতার নিশানা করেছে বিজেপি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হিন্দু ভোটে আস্থা রাখছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এতে তৃণমূল সরকারের মাথা ব্যাথা বেড়েছে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভোট মেরুকরণ বিজেপির বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে মনে মনে করা হচ্ছে। আরও একটি বড় বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা। ইডি ও সিবিআইয়ের একাধিক তদন্তে তৃণমূল নেতারা ক্রমাগত চাপের মুখে। তবে মমতার লড়াইয়ের জায়গাও কম নয়। নারী ও যুব সমাজকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এখনও তৃণমূলের বড় ইতিবাচক দিক। শিক্ষার্থী ও যুবাদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রামাঞ্চলে তৃণমূলের ভিত্তি মজবুত করেছে। পাশাপাশি ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে একসূত্রে আক্রমণ করে রাজনৈতিক আবেগকে কাজে লাগিয়ে ভোট বৈতরণী পেরোতে মরিয়া মমতা। ওদিকে, পুরোদমে রাজনৈতিক অঙ্ক কষছে বিজেপি। লক্ষ্য একটাই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে রাজ্যের ক্ষমতা দখল। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট কিছু আসনকে টার্গেট করে পরিকল্পনা শুরু করেছে বিজেপি শিবির। রাজ্যে মোট ২৯৪টি বিধানসভা আসন রয়েছে। তার মধ্যে ১৪১টি আসনের উপর বিশেষ নজর রেখেছে বিজেপি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই আসনগুলোতে বিজেপি হয় আগে এগিয়ে ছিল, নয়ত তুলনামূলকভাবে কম ব্যবধানে হেরেছে। বিজেপি-র বিশ্বাস, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারলে এই আসনগুলোর বড় অংশ নিজেদের দখলে আনা সম্ভব। ১৪১টি আসনের মধ্যে ৫২টিকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলে মনে করছে বিজেপি নেতৃত্ব। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব আশাবাদী। তাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তাকে সামনে রেখে লড়াই করলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। যেমন: উড়িষ্যা এবং দিল্লিতে ‘মোদী ফ্যাক্টরে’র উপর নির্ভর করেই সাফল্য পেয়েছে বিজেপি। সেই কৌশলেই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গেও বিশেষত মোদীর প্রচারকে সামনে রেখে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে চাইছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে এবার ভোট হবে দুই দফায়। জাতীয় নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন ঘোষণা করেছে। ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ভোটের দিন ঘোষণা করা হয়েছে।


