বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন
চুয়াডাঙ্গায় ৮ বছরেও চালু হয়নি ১০ কোটি টাকার পানি শোধনাগার অনিরাপদ পানির দুর্ভোগে প্রায় দুই লাখ পৌরবাসী
/ ৩৪ দেখা হয়েছে
বার : শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৫ অপরাহ্ন

আলমডাঙ্গা প্রতিনিধি ॥ চুয়াডাঙ্গা পৌরবাসীর নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির স্বপ্ন দেখিয়ে প্রায় এক দশক আগে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক ভূ-গর্ভস্থ পানি শোধনাগার। উদ্বোধনের সময় ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই পৌর এলাকার ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে বিশুদ্ধ সুপেয় পানি। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আজও বাস্তবায়িত হয়নি। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আট বছর পেরিয়ে গেলেও প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি শোধনাগারটি আজও চালু হয়নি। দীর্ঘদিন অচল থাকায় মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, পৌরসভার প্রায় দুই লাখ মানুষ এখনও আয়রন, ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।জানা গেছে, ৩৭ জেলা শহর পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার ছাগলফার্মপাড়ায় ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ভূ-গর্ভস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। নির্মাণ শেষে প্রকল্পটি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হলেও নানা জটিলতায় সেটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।পরবর্তীতে ২০২০ সালে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৮০ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার একটি ওভারহেড পানির ট্যাংক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সেটিও আজ পর্যন্ত কার্যকর করা হয়নি। ফলে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পুরো প্রকল্পটিই বর্তমানে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।বর্তমানে পৌরসভার ১৪টি পাম্প হাউস থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরবরাহকৃত পানিতে অতিরিক্ত আয়রন, ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকায় তা খাবার কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্যও উপযোগী নয়। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার নিজস্ব ফিল্টার ব্যবহার করছেন, আবার অনেকে বাজার থেকে বিশুদ্ধ পানি কিনে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। পৌরসভার নিম্নমানের পানি সরবরাহে অসন্তুষ্ট হয়ে ইতোমধ্যে এক হাজারেরও বেশি গ্রাহক তাদের পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিন অচল থাকায় পানি শোধনাগারের সুইস ভালভ, মোটর, ফিল্টার, পাইপলাইন, রিজার্ভ ট্যাংক, পাম্প গ্যালারি, জেনারেটর, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারসহ বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে। স্টাফ কোয়ার্টার ও ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। চারপাশ আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ভরে গিয়ে পুরো এলাকা অনেকটাই পরিত্যক্ত স্থাপনার রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কয়েক কোটি টাকার এই অবকাঠামো পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে। পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, এই শোধনাগার থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৩৫০ ঘনমিটার এবং প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ঘনমিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন সম্ভব। এতে পৌরসভার মোট পানির চাহিদার প্রায় অর্ধেক পূরণ করা যেত। বর্তমানে পৌরসভার সাড়ে ৬ হাজার গ্রাহকের দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় সাড়ে ৭ হাজার ঘনমিটার। এ জন্য রয়েছে ১১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক। কিন্তু আধুনিক পানি শোধনাগারটি চালু না থাকায় সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। পৌরবাসীর অভিযোগ, উদ্বোধনের সময় দ্রুত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আট বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে একদিকে জনগণের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে অনিরাপদ পানি ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন হাজারো মানুষ। তারা দ্রুত শোধনাগারটি চালু, নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং দীর্ঘদিন প্রকল্পটি অচল থাকার কারণ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।পৌর বাসিন্দা অ্যাড. কাইজার হোসেন জোয়ার্দ্দার বলেন, “পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অনিরাপদ পানি—এই দুটি সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চুয়াডাঙ্গা পৌরবাসীর নিত্যসঙ্গী। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হলেও জনগণ তার কোনো সুফল পাচ্ছে না। দ্রুত এটি চালু করে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।”আরেক বাসিন্দা শহিদ হোসেন বলেন, “পৌরসভার পাইপলাইনের পানি অনেক সময় ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে। পানিতে অতিরিক্ত আয়রন, ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকে। এত বড় একটি প্রকল্প বছরের পর বছর বন্ধ পড়ে থাকা সত্যিই দুঃখজনক। এটি চালু হলে পুরো পৌরবাসী উপকৃত হবে।”এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আনিছুজ্জামান বলেন, “পানি শোধনাগারটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এটি পরিচালনা করা ব্যয়বহুল। একটি শোধনাগার দিয়ে পুরো পৌর এলাকার চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। আরও তিন থেকে চারটি শোধনাগার অথবা নতুন করে নির্দিষ্ট এলাকায় পৃথক লাইন স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি লোকবল সংকটও রয়েছে। বিষয়টি আমরা বিভিন্ন সভায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে থাকা এই প্রকল্পটি এখন শুধু একটি অব্যবহৃত স্থাপনা নয়, বরং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার, নাগরিক সেবা এবং জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে কোটি টাকার এই প্রকল্প একসময় পুরোপুরি পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হবে, আর নিরাপদ পানির অপেক্ষায় থাকা পৌরবাসীর দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হবে।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ
ফেসবুক পেজ