বিনোদন প্রতিবেদক ॥ বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তিতুল্য অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরীর জন্মদিন ছিল ১৯ জুলাই। অভিনয়জীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দেওয়া এই গুণী শিল্পী নির্মাতা হিসেবেও নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। সেই স্বপ্নের নাম ‘এই তুমি সেই তুমি’। কিন্তু কবরীর মৃত্যুর পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সরকারি অনুদানে নির্মিত এই সিনেমাটি এখনো মুক্তি পায়নি। কেন ছবিটি দর্শকের সামনে আসছে না- তা নিয়েই তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। ১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কবরী। মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সুতরাং’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন। এরপর ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বৌ’, ‘ময়না মতি’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় মুখ।
অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাণেও নিজের স্বাক্ষর রাখতে চেয়েছিলেন কবরী। ২০০৬ সালে ‘আয়না’ সিনেমা পরিচালনার পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে সরকারি অনুদানে নির্মাণ শুরু করেন ‘এই তুমি সেই তুমি’। মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক বাস্তবতাকে উপজীব্য করে নির্মিত এই সিনেমার গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপও লিখেছিলেন তিনি নিজেই। এতে অভিনয় করেছেন নিশাত সালওয়া ও রায়হান রিয়াদ। ২০২০ সালে সিনেমাটির শুটিং শুরু হয়। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন কবরী। শুটিং প্রায় শেষ হয়ে এলেও বাকি ছিল মাত্র দুই দিনের কাজ। কিন্তু ২০২১ সালের এপ্রিলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। একই বছরের ১৭ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হলে থেমে যায় ছবিটির নির্মাণকাজ। পরে কবরীর ছেলে শাকের চিশতী মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব নেন। কবরীর রেখে যাওয়া স্টোরিবোর্ড ও পরিকল্পনা অনুসরণ করে বাকি অংশের শুটিং শেষ করা হয়। এরপর সম্পন্ন হয় ডাবিং ও সম্পাদনার কাজ। ২০২৩ সালের শেষ দিকে শাকের চিশতী জানিয়েছিলেন, সিনেমাটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর দেশে মুক্তির পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এরপর আর কোনো অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি তিনি গণমাধ্যমকে দাবি করেছেন, সিনেমায় ইংরেজি সাবটাইটেল সংযোজনের কাজ চলছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডে ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছে। ছাড়পত্র পেলেই সিনেমাটি মুক্তি দেওয়া হবে। তবে এখানেই দেখা দিয়েছে জটিলতা। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের উপ-পরিচালক মঈনউদ্দীন জানিয়েছেন, রোববার পর্যন্ত ‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমাটি সার্টিফিকেশনের জন্য তাদের কাছে জমা পড়েনি। ফলে ছবিটির বর্তমান অবস্থার বিষয়ে বোর্ডের কাছে কোনো তথ্য নেই। অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি অনুদানের কোনো সিনেমা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠাতে হলে মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হয়। পাশাপাশি শুটিং শেষ হওয়ার তথ্য জমা দিয়ে বাকি কিস্তির অর্থ ছাড়ের আবেদনও করতে হয়। কিন্তু ‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কোনো নথি মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই।
ফলে ছবিটির মুক্তি নিয়ে দুই ধরনের তথ্য সামনে এসেছে। একদিকে নির্মাতাপক্ষ বলছে, সিনেমাটি মুক্তির জন্য প্রস্তুত। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর দাবি, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। এ কারণেই ছবিটির মুক্তির বিষয়টি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। উল্লেখ্য, ‘এই তুমি সেই তুমি’ ছিল কবরীর নির্মাতা জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও স্বপ্নের প্রকল্প। করোনা মহামারির ঝুঁকির মধ্যেও তিনি ছবিটির কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, এই সিনেমার জন্য প্রথমবারের মতো গানও লিখেছিলেন তিনি। সংগীত পরিচালনা করেন সাবিনা ইয়াসমিন, আর গান গেয়েছেন ইমরান ও কোনাল। কবরী আজ নেই, কিন্তু তার শেষ স্বপ্নের সিনেমা এখনো বড় পর্দার অপেক্ষায়। জন্মদিনে কিংবদন্তিতুল্য এই অভিনেত্রীকে স্মরণ করতে গিয়ে তাই নতুন করে সামনে এসেছে এক প্রশ্ন- কবে মুক্তি পাবে ‘এই তুমি সেই তুমি’, আর আদৌ কি দর্শক কবরীর শেষ নির্মাণটি প্রেক্ষাগৃহে দেখতে পারবেন?


