কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ এক কাপড়ে বের হওয়া মানুষটার শেষ ভরসা যখন একটা হাসপাতাল, তখন সে আর দশটা দিক ভেবে দেখে না। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সদকী ইউনিয়নের খয়ের চারা গ্রাম। এই গ্রামেরই এক টিনের ঘরে থাকতেন ৬৫ বছরের বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম। স্বামী জালাল শেখ আর ছেলে মাসুম রানাকে নিয়ে ছিল তার সাদামাটা সংসার। কিন্তু গত ১০ জুলাই, শুক্রবারের সকালে হঠাৎ করেই আনোয়ারা বেগমের পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। বৃদ্ধা মায়ের যন্ত্রণায় ছটফট করা দেখে ছেলে মাসুম রানা মাকে নিয়ে ছুটে যায় স্থানীয় ‘লোটাস চক্ষু হাসপাতালে’। নামে ‘চক্ষু হাসপাতাল’ হলেও, সেখানে নাকি সব রোগেরই চিকিৎসা হয় এমনটাই বিশ্বাস ছিল সাধারণ মানুষের। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ডাক্তাররা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাসহ নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। রিপোর্ট দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানালেন, “পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে। জরুরি অপারেশন করাতে হবে। রোগীর ছেলে মাসুম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ৩০ হাজার টাকায় পিত্তথলির পাথর অপারেশনের চুক্তি করে। সব ঠিকঠাক করে শুক্রবার বিকেলেই আনোয়ারা বেগমকে ওটি (অপারেশন থিয়েটার)-তে নেওয়া হয়। এর পর অপারেশন শেষ হয়। ওটির বাইরে অপেক্ষারত পরিবারের লোকজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও। সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি কয়েক মুহূর্তের জন্যও। অপারেশনের পর থেকেই ছটফট করতে লাগলেন আনোয়ারা বেগম। স্বজনদের হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, আমার পেটটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে! সারা শরীর কেমন পুড়ে যাচ্ছে। এমন আকুতি শুনে স্বজনরা ছুটে গেল নার্স আর ডাক্তারদের কাছে। চিকিৎসকরা এসে তড়িঘড়ি করে নানারকম ইনজেকশন আর ওষুধ দিতে লাগলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যন্ত্রণার উপশম হওয়া তো দূরের কথা, বৃদ্ধার অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হতে শুরু করল। পুরোটা রাত এবং পরের দিন শনিবারের পুরোটা সময় হাসপাতালে কেবল আনোয়ারা বেগমের যন্ত্রণার গোঙানি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। শনিবার রাত তখন প্রায় ১১টা। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা যখন বুঝলেন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ তাদের হাতের বাইরে চলে গেছে, তখন তারা দায় এড়াতে রোগীকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে রেফার করার তাগিদ দিলেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে মুমূর্ষু মাকে নিয়ে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিল মাসুম। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, কুমারখালীর আলাউদ্দিন নগর পৌঁছাতেই গাড়ির ভেতরেই আনোয়ারা বেগমের শরীরটা নিথর হয়ে গেল। ছটফট করতে থাকা মানুষটা চিরতরে শান্ত হয়ে গেলেন। চোখের অস্ত্রোপচারের নামে চলা এক হাসপাতালে পিত্তথলির অপারেশন করাতে এসে মাকে চিরতরে হারিয়ে বাড়ি ফিরল সে। পরের দিন শনিবার বিকেলেই বিষাদগ্রস্থ্য খয়ের চারা গ্রামে তাকে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে আনোয়ারা বেগমের ভাতিজি হাফিজা খাতুন ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “পিত্তথলির পাথর অপারেশনে মানুষ মারা যায়, এমনটা তো সচরাচর শুনি না। ফুফুর অপারেশনের পর থেকে একটা মুহূর্তের জন্যও তিনি ঘুমাতে পারেননি, শুধু ব্যথায় চিৎকার করেছেন।” আনোয়ারা বেগমের ছেলে মাসুম রানা বলেন, আমার মায়ের পিত্ত্ থলিতে পাথর অপরেশন জন্য লোটাস চক্ষু হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি করা হয় শুক্রবার বিকেলে। অপারেশনের পর থেকেই আমার মায়ের পেটে ব্যথা ও শরীর খারাপ হতে থাকে। শনিবার রাতে অবস্থা সংকটাপন্ন হলে রাত প্রায় ১১ টার দিকে কুষ্টিয়া হাসপাতালে নেওয়ার পথে আমার মা মারা গেছে। কি ভাবে মারা গেলো তা বলতে পারবোনা। ওই হাসপাতালে কোন অনুমোদন নেই এটা আমি জানতাম না। লোটাস চক্ষু হাসপাতালের পরিচালক বিশ্বজিতের কাছে, এই অবৈধ কার্যকলাপ ও ভুল চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “রোগী তো হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। আর হাসপাতালের অনুমোদনের জন্য টাকা জমা দেওয়া আছে, খুব শীঘ্রই কাগজ পেয়ে যাব। এই বিষয়ে কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন মুঠোফোনে বলেন, “লোটাস হাসপাতালের চোখের কার্যক্রম আমি আগেই বন্ধ রেখেছিলাম। এছাড়া প্যাথলজি বিভাগেরও কিছু কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল, শুধু ক্লিনিক অংশটি খোলা ছিল। সেখানে গত শুক্রবার একজন প্রবীণ মানুষের পিত্তপাথরের অপারেশন করা হয়। পরবর্তীতে কিছু জটিলতা দেখা দেয় এবং এর এক-দুই দিন পর তিনি মারা যান।”
তিনি আরও বলেন, “যেহেতু বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে এসেছে, তাই আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে (ইউএইচএফপিও) তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন আসার পর সেই অনুযায়ী আমরা পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম ও পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”


