এনএনবি : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটা কোনও সমস্যাই নয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা আছে। তবে ইসরায়েলের বিষয়টি ভিন্ন। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে আগে এক দফা সংঘাত- সব মিলিয়ে ক্লান্ত ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। গত শনিবার ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইসরায়েল টানা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছে। এতে ইসরায়েলে বারবার সতর্কতা সাইরেন বাজছে, স্কুল বন্ধ করা হচ্ছে ও লাখ লাখ রিজার্ভ সেনা তলব করা হয়েছে। হাইফা ও তেল আবিবের মতো শহরগুলো লাগাতার হামলার মুখে পড়ছে। জরুরি পরিষেবা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যে মাত্রার যুদ্ধ ইসরায়েল সরকার অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে তার সঙ্গে সেদেশের মানুষ অভ্যস্ত নয়। তাদের বোমা থেকে বাঁচতে বাংকার বা শেল্টারে আশ্রয় নিতে ছোটছুটির মধ্যেই গত কয়েক দিন পার করতে হয়েছে। যুদ্ধ নিয়ে আপাতত ইসরায়েলের জনগণের উৎসাহ বেশি। বড় বড় শহরে ইসরায়েলিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখা গেছে, তারা এমন এক শত্রুর মোকাবেলা করতে চায় যাদের সম্পর্কে তাদেরকে কয়েক দশক ধরে বলা হয়েছে যে, তারা (ইরান) ইসরায়েলকে নির্মুল করতে সংকল্পবদ্ধ। কট্টর বামপন্থিরা ছাড়া সব রাজনৈতিক দলই সরকারের পতাকাতলে একত্রিত হয়েছে। ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ইসরায়েল সামরিকবাদের ঢেউয়ে ভেসে গেছে। তিনি বলেন, “এবারের যুদ্ধ ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের সংঘাতের মতো নয়। তখন ইসরায়েলিদের মনে আতঙ্ক ও অস্তিত্ব রক্ষার ভয় ছিল। তাদের ভয় ছিল, ইরান হয়ত ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দেবে। আর এখনকার এই যুদ্ধ বেপরোয়া সামরিকবাদ এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।” “যুদ্ধের গুটিকয় সমালোচকও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে এই যুদ্ধ ‘সংক্ষিপ্ত’ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন, যেন ইসরায়েল চাইলেই যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা ঠিক করতে পারবে,” বলেন শির হেভার। যুদ্ধে সমর্থনকে অনেকেই ইসরায়েলি সমাজের উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার অংশ হিসেবে দেখছেন। আগে যারা প্রান্তিক উগ্র-ডানপন্থি রাজনীতিবিদ ছিলেন, তারা এখন সরকারের কেন্দ্রে চলে এসেছেন। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক চাপে তরুণ ও মেধাবীদের দ্রুত দেশ ছেড়ে চলে যাওযার প্রবণতা বাড়ছে। যারা দেশে রয়ে গেছেন তারা ইতোমধ্যেই ইরানকে তাদের দেশের প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন এবং কয়েক সপ্তাহের এই যুদ্ধ সমাজকে আরও বেশি সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, “এটি অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ওপর নাৎসি জার্মানির বিমান হামলার (দ্য ব্লিৎজ) মতো।” তিনি আরও বলেন, “তখন ব্রিটিশরা এই বোমাবর্ষণ মেনে নিয়েছিল, কারণ তারা নিজেদেরকে এক চরম অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হিসাবে দেখেছিল। ইসরায়েলিদের অনুভূতিও একই রকম। আমাদের প্রায় জন্ম থেকেই বিশ্বাস করতে শেখানো হয় যে, ইরান এক অশুভ শক্তি; যা কিন্ডারগার্টেন, হাই স্কুল এবং সেনাবাহিনীতে যাওয়ার পর আরও বদ্ধমূল হয়।” বার-তালের মতে, কয়েক সপ্তাহের এই নতুন যুদ্ধ থেকে কী ধরনের ইসরায়েলি সমাজ বেরিয়ে আসবে তা অনুমান করা অসম্ভব; তবে এটুকু বলা যায় যে, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’র (বিপর্যয়) গণহত্যা বা সাম্প্রতিক গাজায় সংঘটিত গণহত্যার ঘটনায় রাষ্ট্রের ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে দেশটির যে মজ্জাগত নৈতিক দৃঢ়তা ছিল, তাতে কোনো চিড় ধরেনি। তিনি বলেন, “এখন আমাদের হাতে এমন এক প্রজন্ম আছে যারা আগের চেয়েও বেশি যুদ্ধবাজ এবং ডানপন্থি। নেতানিয়াহু আমাদের বলছেন যে, এখন আমাদের তলোয়ারের ওপর ভর করেই বাঁচতে হবে। এটি মূলত এই কথারই প্রমাণ যে, টিকে থাকার জন্য ইসরায়েলের শত্রুর প্রয়োজন।”
বোমা ও বন্দুকের হিসাব: যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সামাজিক প্রভাবের বাইরেও ইসরায়েলকে তাদের সামরিক হিসাব-নিকাশ বিবেচনায় নিতে হবে। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে, ইরানের মতো মাত্রার সামরিক শক্তিধর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইসরায়েল বর্তমান মাত্রার যুদ্ধ কত দিন চালিয়ে নিতে পারবে, তা নিরূপণ করে নিতে হবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজে আত্তার বলেন, ইসরায়েল কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারবে তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো মিত্রদের সমর্থন এবং ইরানের শক্তি ফুরানোর আগেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিঃশেষ হয় কিনা তার ওপর। তিনি সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, “যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে ইরান ইসরায়েলে ২০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তারা প্রায় ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, যার প্রতিটি ঠেকানোর জন্য ইসরায়েলকে একটি করে ইন্টারসেপ্টর রকেট ছুড়তে হয়েছে। এটি সম্ভবত ইসরায়েলের একার সামলানোর ক্ষমতার বাইরে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য না থাকলে তারা এতক্ষণে তাদের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত।” ইসরায়েলের তিন স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে: স্বল্প পাল্লার রকেট ও কামানের গোলার জন্য ‘আয়রন ডোম’; মাঝারি পাল্লার রকেট ও ক্রুজ মিসাইল ঠেকানোর জন্য ‘ডেভিডস স্লিং’; এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য তৈরি ‘অ্যারো-২’ ও ‘অ্যারো-৩’। ইসরায়েলিরা তাদের মজুদে কতগুলো ইন্টারসেপ্টর আছে তা প্রকাশ করে না। তবে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তাদের ইন্টারসেপ্টর রকেটের মজুদ কমতে শুরু করেছিল। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের জন্য উচ্চমাত্রার প্রতিরক্ষা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারে রেশনিং বা কৃপণতা করতে হতে পারে এবং শুধুমাত্র সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু রক্ষার দিকে নজর দিতে হতে পারে, যা বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আত্তার বলেন, ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্র অনুযায়ী গতবছর জুনের সংঘাতের পর থেকে ইরান প্রতি মাসে ১০০টি হারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা থেকে ধারণা করা যায় যে তেহরান ইতিমধ্যে বিশাল একটি মজুদ গড়ে তুলেছে। তবে আত্তার এটিও উল্লেখ করেন যে, ইরানের হুমকি মূলত তাদের কাছে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধরনের ওপর নির্ভর করে। তিনি বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের বিবরণ দিয়ে বলেন, “আমরা জানি না তাদের কাছে ঠিক কী ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে। তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র গ্রিস ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে; মাঝারি পাল্লারগুলো ইসরায়েলে পৌঁছাতে পারে এবং স্বল্প পাল্লারগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।” আত্তার আরও বলেন, “একইভাবে আমরা জানি না ১২ দিনের যুদ্ধের আগে তাদের কাছে কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, ওই যুদ্ধে কতগুলো ধ্বংস হয়েছে বা বর্তমানে তাদের কতগুলো লঞ্চার (উৎক্ষেপণ যন্ত্র) আছে। যদি আপনার কাছে লঞ্চার না থাকে, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল লক্ষ্যবস্তু করছে, তবে আপনার কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র আছে তা কোনও গুরুত্ব বহন করে না। এটি অনেকটা রাইফেল ছাড়া গুলির মতো।” অর্থনৈতিক বিবেচনা: বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রায় নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ ইসরায়েলের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। গোলাবারুদের উচ্চমূল্য এবং পরিকল্পনার চেয়েও বেশি সময় ধরে কয়েক লাখ রিজার্ভ সেনা মোতায়েন ইসরায়েলি কোষাগারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৪ সালে লেবানন ও গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের ব্যয় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল বলে জানা গেছে, যা দেশটিকে গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতির মুখে ফেলেছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসব যুদ্ধ ব্যয় ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। অর্থনীতির ওপর এই চাপের ফলে ২০২৪ সালে বিশ্বের তিনটি প্রধান ক্রেডিট রেটিং সংস্থাই ইসরায়েলের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, “ইসরায়েল বর্তমানে ঋণ সংকট, জ্বালানি সংকট, পরিবহন সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।”
তবে এই রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেন, এর কোনোটিই ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, “এটি অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, এটি প্রযুক্তির প্রশ্ন।” তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে এমন উন্নত অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে যা নিজে নিজেই লোড হতে পারে, লক্ষ্য স্থির করতে পারে এবং এত দূর থেকে হত্যা করতে পারে যেখানে সেনাদের নিজেদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলতে হয় না, তবে আমি মনে করি না যে ইসরায়েলে চলা অর্থনৈতিক সংকট তাদের এই আগ্রাসন থামানোর জন্য যথেষ্ট হবে।”


