কৃষি প্রতিবেদক ॥ আঙ্গুর গাছের ডাল সময়মতো ও সঠিকভাবে ছাঁটাই না করলে ফুল-ফল ধরে না। আঙ্গুর গাছের বিভিন্ন পরিচর্যার মধ্যে একটি হলো ডাল ছাঁটাই। এই গাছের ডাল বা শাখায় ফুল ধরে। তাই এটা না করলে ফলন অর্ধেকে নেমে যায়। প্রতিবার ফুল ধরার পর ডাল বা শাখাটি পুরনো হয়ে যায় এবং ওই ডাল বা শাখায় আর ফুল-ফল ধরে না। এসব পুরনো ডাল বা শাখা গাছে থাকলে খাবারে ভাগ বসায় এবং গাছে নতুন শাখা-প্রশাখা গজাতে বাধা দেয়। শীত আসার সাথে সাথেই আঙ্গুরের পাতা ঝরে যায়। পুরো শীতে গাছ পাতাবিহীন অবস্খায় থাকে। শুধু কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখা দেখে মনে হয় যেন গাছটি মরে গেছে। কিন্তু বসন্ত শুরু হওয়ার পর আঙ্গুর গাছে ফুল-ফল ধরতে শুরু করে। তবে ফল পাকতে পাকতে বর্ষা চলে এলে ফল মিষ্টি হয় না। বাংলাদেশে যেসব জাতের ফল আগে আসে এবং আগে পুষ্ট হয় সেসব জাতের কিছু ফল মিষ্টি হতে দেখা যায়। আঙ্গুর ফল পুষ্ট হওয়ার পর পাকা অবস্খায় গাছ থেকে পাড়তে হয়। এটি লিচুর মতো আগে পেড়ে ফেললে পরে আর পাকে না। এ দেশে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে আঙ্গুর গাছ ছাঁটাই করলে মার্চ-এপ্রিলে ফল পাওয়া যায়। তবে দেরিতে ফল সংগ্রহ করলে আকাশ একটানা মেঘলা থাকা বা বৃষ্টির কারণে ফল টক হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এর কারণ হলো গরমে আঙ্গুর ফলে চিনিজাতীয় পদার্থ বেড়ে যায়। ফল ঠিকমতো বড় ও মিষ্টি না হলে, ফল ধরার পর প্রতি লিটার পানিতে ৫০ মিলিলিটার ইথরেল ও ১০০ মিলিগ্রাম জিবারেলিক অ্যাসিড পাউডার (জিবগ্রো ৫জি বা বারান্টো-৮০%) একত্রে মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে। গাছ রোপণের প্রথম বছর হালকাভাবে ডাল ছাঁটাই করে দিতে হয়। পরের বছরে গোড়া থেকে ১.৫ মিটার উচ্চতায় গাছ কেটে দিতে হয়। প্রথম বছরে ফল নেয়ার পর ডালগুলো ১০-১৫ সেন্টিমিটার লম্বা রেখে শীতের শুরুতেই আবার কাটতে হয়। বসন্তের শুরুতে কাটা ডালগুলো থেকে অনেক চোখ ও শাখা বের হয়। এভাবে তিন-চার বছর পর্যন্ত একই গাছ থেকে ফল নেয়া যায়। এরপর যখন ডালগুলো থেকে নতুন শাখা কম গজায় বা ফুল ও ফল কম ধরে তখন মূল কাণ্ডটিকে গোড়া থেকে ৭-১০ সেন্টিমিটার উচ্চতায় কেটে দিতে হয়। সেখান থেকে নতুন ডাল গজালে সতেজ দেখে এক-দু’টি ডাল রেখে আগের পদ্ধতিতে নতুন শাখা বের করানো যায়। ডাল ছাঁটাইয়ের পর গাছে সার দেয়া ভালো। গাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধির জন্য পটাশজাতীয় সারের প্রয়োজন খুব বেশি। পটাশের অভাবে গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ডাল ভঙ্গুর প্রকৃতির হয় এবং ফল ফেটে যায় ও ফলের মধ্যকার মিষ্টি কমে যায়। প্রথম বছর গাছ প্রতি ১০-১৫ কেজি জৈব সার, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি এবং ২৫০ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করতে হয়। এরপর প্রতি বছর পাঁচ কেজি জৈব সার, ১০ গ্রাম হারে ইউরিয়া ও টিএসপি এবং ২০ গ্রাম এমওপি সার দিতে হয়। পটাশ সার দু’বারে দিতে হয়। শীতের আগে ডাল ছাঁটাই করার পর অর্ধেক এবং
শীতের শেষে নতুন ফল ধরতে আরম্ভ করলে বাকি অর্ধেকটুকু। জৈব সার ও টিএসপি ছাঁটাই করার পরপরই প্রয়োগ করতে হয়। ইউরিয়ার এক-তৃতীয়াংশ ছাঁটাইয়ের সময়, এক-তৃতীয়াংশ ফল ধরার পরপরই এবং শেষটুকু ফল মাঝারি আকারের হলে গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হয়। আঙুরের ফলন বারাতে করণীয় আঙুর একটি অতিলতানো গাছের ফল। শাখা-কলমের বেলায? প্রায? এক ফুট দীর্ঘ শাখা-খণ্ডের এক-তৃতীয় অৎ শকে মাটির নিচে কাত করে পুঁতলে ভালো হয?। বয?স্ক গাছের জন্য প্রতি বছর এপ্রিল মাসে দুই কেজি তেলের খৈল, এক কেজি হাড? চূর্ণ এবং এক পোয?া সালফেট অব পটাশ ব্যবহার মন্দ নয?। কারও কারও মতে ইউরিয?া, সুপার ফসফেট ও মিউরেট অব পটাশের ১:৩:৩ অনুপাতে মিশ্রণ ব্যবহার উত্তম। ছোট চারা গাছের জন্য এ মিশ্রণের প্রায? দুই ছটাক এবং বেশ বয?স্ক গাছের জন্য প্রায? এক কেজি পর্যন্ত প্রয?োগ করা যেতে পারে। চারা পরস্পর থেকে ১০ ফুট দূরে রোপণ করা যেতে পারে। আঙুরের জন্য একটি শক্তিশালী প্রধান কাণ্ড গঠন আবশ্যক। এর যেসব শাখা জন্মে তার গায?ে ফল-পল্লব দেখা যায?। সাধারণত ফল সংগ্রহের পর যখন পাতা ঝরে যায? তখন শাখা ছাঁটাই করা হয?। সব শাখাকেই এমনভাবে ছেঁটে দেয?া যেতে পারে, যাতে ওটার গায?ে কেবল দুই থেকে তিনটি চোখ বাকি থাকে। যেসব শাখা অতি শক্ত হয?ে যায? তার অধিকাংশই কাটা যেতে পারে। ফলের গুচ্ছ থেকে কিছু কিছু ফল কাঁচি দ্বারা কেটে পাতলা করে দিলে ফল উত্কৃষ্ট হয?। এপ্রিল-মে মাসে ফুল দেখা দেয? এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ফল পাকে। গাছপ্রতি ১০ থেকে ১৫ কেজি আঙুর পাওয?া যায?।সরকারি পর্যায?ে আঙুর উত্পাদনের প্রচেষ্টার শুরু হয? ১৯৯১ সালে বিএডিসির কাশিমপুর উদ্যান কেন্দ্রে। উক্ত প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাঠ পর্যায?ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে আঙুরের চাষ, উত্পাদন ও বাজারজাতকরণ জনপ্রিয?তা অর্জন করেছে। স্বল্প পরিমাণ প্রশিক্ষণই প্রায? যে কোনো গৃহস্থকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে আঙুরের উত্পাদনে। আঙুরের চাষ হতে পারে :
(১) গার্হস্থ্য পর্যায?ে, (২) মাঠে এককভাবে এবং (৩) মিশ্র ফল বাগানের অন্যতম ফল গাছরূপে। এর রোপণ দূরত্ব ১০ ফুটের মতো, সে কারণে এটি আম কিংবা কাঁঠালভিত্তিক মিশ্র ফল বাগানের তৃতীয? সদস্যরূপে স্থান পেতে পারে। আঙুর গাছ দীর্ঘায?ু হওয?ার ফলস্বরূপ আম, কাঁঠাল, নারকেল, খেজুর, তাল ইত্যাদির মতোই মানুষ এর ফল ভোগ করতে পারে একরূপ বংশ পরম্পরায?। যেহেতু আঙ্গিনা-বাগানে আঙুরের আবাদের জন্য বেশি জায?গা বা অর্থের দরকার হয? না, সেহেতু দরিদ্র চাষীভাই অল্প জায?গা থেকেই অধিক আয? করতে পারেন। আঙুর গাছ দীর্ঘদিন বাঁচতে পারে (শত বছরের বেশি) এবং পরিচর্যায? তেমন উল্লেখযোগ্য খরচ নেই। আমাদের দেশে এ যাবত্ তিনটি উত্পাদনশীল আঙুর গাছের জাত নির্বাচন করা হয?েছে। (১) জাককাউ
(২) ব্ল্যাক রুবী ও (৩) ব্ল্যাক পার্ল। তিনটি জাতই গ্রীষ্মকালীন এবং পরে তিনটি রংয?ে রূপান্তরিত হয?ে যথাক্রমে হালকা বাদামি, কালো ও করমচা রং ধারণ করে। ফলন আসতে সময? লাগে প্রায? দু’বছর। মিষ্টতার পরিমাণ ১৮ থেকে ২০ শতাংশ । মাটির পিএইচ ৬.৫-৭.৫ হলে আঙ্গুর দ্রুত মিষ্টি হয?। গাছের দীর্ঘায?ু বিবেচনা করে মাচায? লোহার তারের ব্যবস্থা করা ভালো। মাচায? ওঠা পর্যন্ত আঙুর গাছের পার্শ্ব শাখা ভেঙে দিতে হবে। আর যা যা করবেন তা হলো মাচায? প্রথম ডগা উঠবার মুহূর্তে তা ভেঙে দিতে হবে যাতে কর্তনকৃত অংশের নিচ থেকে দুটি কচি ডগা ইংরেজি ‘ভি’ আকারে মাচায? ওঠে এবং ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা হবে। দুটি ডগার মাথা পুনরায? ৫০ সেন্টিমিটার দূরে ভেঙে দিতে হবে, যাতে প্রতি শাখার উভয? পার্শ্বে অনধিক দুটি করে চারটি প্রশাখা গজায? এবং তা পুনরায? ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড? হবে।
উত্পাদিত আটটি প্রশাখা ৫০ সেন্টিমিটার বড? হওয?ার পর তা আবার মাথা ভেঙে দিতে হবে এবং এরপর গাছ যথারীতি বড? হতে থাকবে। গাছ রোপণের উপযুক্ত সময? মার্চ থেকে মে। তবে আগস্ট মাস পর্যন্ত রোপণ করা যাবে। এরপর গাছের সতেজতা কমে যাবে। অক্টোবর থেকে জানুয?ারি পর্যন্ত গাছ ঘুমন্ত অবস্থায? থাকবে এবং পাতা ঝরে যাবে। বছরে দু’বার ফুল আসবে। মার্চ ও জুলাই মাসে তা আঙুরে রূপান্তরিত হবে। ফুল আসার পর থেকে আঙুর মিষ্টি হতে সময? লাগবে ১২০ দিন বা চার মাস। নির্দিষ্ট সময?ের আগে আঙুর কাটলে ‘টক’ লাগবে। ফুল আসার ৭০-৮০ দিনের মধ্যে সবুজ অবস্থায? আঙ্গুর স্পঞ্জের ন্যায? নরম হবে। এটা আঙুরের পরিপকস্ফতা বুঝায?। পরবর্তীকালে ৪০ দিন সময? নিবে আঙুর মিষ্টির পর্যায?ে যেতে। ৭০-৮০ দিনের সময? গাছপ্রতি ২০ গ্রাম পটাশ পানির সঙ্গে মিশিয?ে দিলে আঙুর দ্রুত মিষ্টির পর্যায?ে চলে যায?। ফুল থেকে আঙুর মুগ ডালের মতো আকার হলে জিবরেলিক এসিড ছিটিয?ে প্রয?োগ করলে আকারে ও আকৃতিতে বড? হয?। ফুল থাকা অবস্থায? কীটনাশক ওষুধ প্রয?োগ নিষেধ। আঙুরের থোকায? হাত লাগানো উচিত নয?, এতে চামড?ার উপরের সাদা পাউডার হাতের ছোঁয?ায? উঠে যায? এবং পোকার আক্রমণ সহজতর হয?। থোকায? আঙুুর যখন মুগ ডালের আকারে থাকে তখন ছোট অবস্থায? কিছু আঙ্গুর বাছাই করে ফেলে দেয?া ভাল যাতে আঙ্গুরের সাইজ সুন্দর থাকে। আঙ্গুর পাকার সময? বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকায? মাচার উপরে ‘পলিথিন সীট’ দিয?ে আবৃত করে দিতে হবে যাতে গাছে বৃষ্টির পানি না লাগে। লাগলে পাকা আঙ্গুর ফেটে যাবার সম্ভাবনা থাকে। প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময?ে তিনটি কাজের পরিচর্যা নিয?মিতভাবে করতে হবে। এগুলো হলো: (ক) প্রতি বছর জানুয?ারি মাসের দ্বিতীয? সপ্তাহের মদ্যে গাছের গোড?ায? মাটি হালকাভাবে কুপিয?ে আলগা করে তাতে অনুমোদিত সার প্রয?োগ করে শুধুমাত্র একবার বেশি করে পানি দিতে হবে। (খ) জানুয?ারি মাসের ৪র্থ সপ্তাহে ঘুমন্ত গাছের শাখা-প্রশাখা ছাটাই করে দিতে হবে। ছাটাইকৃত ডালগুলো কেটে পরে মাটিতে পুতে পানি দিলে পুনরায? নতুন গাছ হবে। (গ) ফেব্রুয?ারি মাসের ১ম সপ্তাহে সামান্য গরম আরম্ভ হবার সাথে সাথে গাছের গোড?ায? পানি সেচ দিতে হবে, যে পর্যন্ত না বৃষ্টি হয?। পানি দেবার ১০ দিনের মধ্যে গাছে নতুন শাখা-প্রশাকা গজাবে এবং তাতে ফুল দেখা দিবে যা পরবর্তীতে আঙ্গুরে রূপান্তরিত হবে।’


