এনএনবি : রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে হওয়া আন্দোলন দমাতে ১৯৮৯ সালের ৪ জুন বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও এর আশপাশে সাঁড়াশি অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই ঘটনায় নিহতের সঠিক সংখ্যা এখনও অজানা। পাশাপাশি ঘটনাটি নিয়ে চীনে আলোচনাও নিষিদ্ধ। তিয়েনআনমেন স্কয়ারে রক্তক্ষয়ী সে ঘটনার ৩৭তম বার্ষিকীতে নিহতদের স্মরণ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
তিনি বলেছেন, সেন্সরশিপ বা কড়াকড়ি আরোপ করে ১৯৮৯ সালের দমনপীড়নের স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে না। মতামত প্রকাশের অধিকার রক্ষার জন্য যারা সেদিন আত্মত্যাগ করেছিলেন, একদিন তারা অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবেন।’ ৪ জুন নিহতদের স্মরণে দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার ও মতপ্রকাশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের একদিন ঠিকই ন্যায়বিচার দেওয়া হবে। এদিকে তিয়েনআনমেন স্কয়ার নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর করা মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃত করা হয়েছে। এটি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সমান।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র মাও নিং বলেন, ওই রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়ে চীন সরকার অনেক আগেই একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভুল মন্তব্যগুলো ঐতিহাসিক তথ্যকে বিকৃত করে। এটি চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। ১৯৮৯ সালের দিনটি স্মরণে ৩ জুন নিহতদের কবরে প্রার্থনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্বজনরা। অভিযোগ উঠেছে, কর্তৃপক্ষ সে কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে। এমন পদক্ষেপকে ‘হৃদয়হীন কাজ’ বলে আখ্যা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। কী ঘটেছিল তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ১৯৮৯ সালের ৪ জুন বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারে গণতন্ত্র ও অধিকারের দাবিতে আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ওপর চীনা সরকারের সামরিক বলপ্রয়োগের ঘটনাটি বিশ্ব ইতিহাসে ‘তিয়েনআনমেন স্কয়ার হত্যাকা-’ বা ‘৪ জুনের ঘটনা’ নামে পরিচিত। প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে চলা একটি শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনকে যেভাবে ট্যাংক এবং বুলেট দিয়ে পিষে ফেলা হয়েছিল, তা আজও বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়। আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয় আশির দশকের অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও রাজনৈতিক স্থবিরতার মধ্য দিয়ে। ১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির উদারপন্থি নেতা হু ইয়াওবাংয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে শিক্ষার্থীরা বেইজিংয়ের রাস্তায় নেমে আসেন। হু ইয়াওবাং দলীয় দুর্নীতি দূর করা এবং বাকস্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতেন। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সরকারি দুর্নীতি বন্ধ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি তুলতে শুরু করেন। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে প্রায় ১০ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটে। শিক্ষক, শ্রমিক এবং সাধারণ নাগরিকরাও যোগ দেন। শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন শুরু করলে আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়। চীনা সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব এ আন্দোলনকে তাদের একদলীয় শাসনের প্রতি চরম হুমকি হিসেবে দেখেন। মে মাসের শেষের দিকে বেইজিংয়ে সামরিক আইন জারি করা হয়। এরপর আসে ৩ জুন রাতের সেই চূড়ান্ত ও নৃশংস সিদ্ধান্ত। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে পিপলস লিবারেশন আর্মির (চখঅ) বিপুলসংখ্যক সৈন্য, যুদ্ধট্যাংক এবং সাঁজোয়াযান নিয়ে তিয়েনআনমেন স্কয়ারের দিকে অগ্রসর হয়। স্কয়ারে অবস্থানরত নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হয়। সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করে এবং ট্যাংকগুলো ব্যারিকেড ভেঙে আন্দোলনকারীদের ওপর দিয়ে চলে যায়। ৪ জুন ভোরের মধ্যে পুরো স্কয়ার রক্তস্নাত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে দমন করা হয়। এ হত্যাকা-ে কতজন মানুষ প্রাণ হারান, তার সঠিক সংখ্যা আজও অজানা। চীনা সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের সংখ্যা মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ বলা হলেও ছাত্র সংগঠন, রেড ক্রস এবং বিদেশি কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের মতে এ সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। এ ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। পশ্চিমা দেশগুলো চীনের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অস্ত্র ক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ৫ জুন সকালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারের দিকে ধেয়ে আসা ট্যাংকের সারির সামনে একাকী এক যুবকের দাঁড়িয়ে থাকার ছবি ‘ট্যাংক ম্যান’ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের বৈশ্বিক প্রতীক হয়ে ওঠে।
চীনের মূল ভূখ-ে আজও ‘তিয়েনআনমেন স্কয়ার’ সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য, ছবি বা আলোচনা কঠোরভাবে সেন্সর করা হয়। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে ইন্টারনেট সব জায়গা থেকে এ ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রতি বছর ৪ জুন বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারকর্মীরা এ নির্মম হত্যাকা-ের শিকার হওয়া শহীদদের স্মরণ করেন।


