কাগজ প্রতিবেদক ॥ কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়া বাড়িতে আজ সোমবার উদ্ধোধন হতে যাচ্ছে একদিন ব্যাপী দোলপুর্ণিমা উৎসব বা লালন স্মরণোৎসব। পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষ্যে এবার থাকছে না গ্রামীণ মেলা ও গানের আসর। একেবারে সীমিত পরিসরে একদিনের আয়োজন। পুরো উৎসব প্রাঙ্গনে থাকছে তিন স্তরের নিরাপপ্তা বেষ্টনী। থাকছে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ। সীমিত উৎসবকে সফল করতে শেষ হয়েছে সকল প্রস্তুতি।
বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই’র জীবদ্দশায় শিষ্যদের নিয়ে এমন ফাগুন মাসের দোল পূর্ণিমায় আখড়াবাড়ীতে চলতো রাত ধরে তত্ব কথা আলোচনা ও গান বাজনা। এ উৎসবে যোগ দিতে এরই মধ্যে দেশের নানা প্রান্ত থেকে বাউল তীর্থভূমি ছেঁড়িয়ার আখড়া বাড়িতে ছুটে এসেছেন সাধু-গুরু, বাউল, ভক্তরা। ছোট দলে ভাগ হয়ে দরদ ভরা গলায় গেয়ে চলেছেন লালনের গান। প্রতিবছরের উৎসবের কয়েকদিন আগেই বাউল-ফকিরদের আনাগোনায় ভরে উঠতো মাজার প্রাঙ্গন কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম। সরজমিনে সাঁইজীর আখড়াবাড়ীতে গেলে দেখা যায়, অডিটোরিয়ামের নিচে হাতে গোনা কয়েকজন বাউল ফকির অলস সময় কাটাচ্ছেন। কেউ খোশ গল্প করছেন, কেউ এক তারা নিয়ে আপন মনে গান গাইছেন। কথা হয় ঢাকা থেকে আসা বাউল সাধক আরেফিন শাহের সাথে। তিনি জানান, আজ ২০ বছর হলো ঢাকা থেকে এখানে আসেন। প্রতি বছর তিরোধান ও দোল উৎসবে। উৎসব শুরুর কয়েকদিন আগে আগেন আবার কয়েকদিন পরে চলে যান। কুষ্টিয়ায় এক সাধুর কাছে বায়াত গ্রহন করেছেন। শেষ জীবনটা এখানেই কাটিয়ে দেবেন। দোলউৎসবের পর্ব হয় অষ্টপ্রহরব্যাপী কিন্তু নানা প্রতিকুলতায় সেটা করা সম্ভব হয় না। প্রতি বছর চারটি প্রহরে সাধুরা এটা শেষ করেন। কিন্তু পবিত্র রমজানে এবার তাও হচ্ছে না। এক প্রহরেই শেষ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তার পরও কোন অভিযোগ নেই। বাউল আনাস শাহ জানালেন, সাঁইজীই বলেছেন, দেশ সমস্যা অনুসারে ভিন্ন বিধান হতেও পারে। তাই যেখানে যেমন, তাই মেনে নিতে হবে।
লালন সংগীত চ্চর্চা কেন্দ্রে পরিচালক সাজিদুল ইসলাম ডালিম জানালেন, লালনের মানবতাবাদি কথা ও গান নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। তবেই যত সংঘাত, সংঘর্ষ সমাজ-রাষ্ট্র থেকে দুর হবে। তিনি বিশেষ করে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে লালনের গান, দর্শনকে সংযুক্ত করার আহবান জানান। লালন মাজারের খাদেম জানান, গত বারের তুলনায় এবার আয়োজন সীমিত। শুক্রবার গোসল দিয়ে আসন নিয়েছেন বাউল সাধুরা। চলবে চারপ্রহরব্যাপী। রাতে অধিবাস, সকালে রাখাল সেবা, দুপুরে মাছ-ভাত দিয়ে পুর্ণসেবা দিয়ে দোল উৎসবের সমাপনি ঘটবে। তিনি আরও জানান, আয়োজন সফল করতে লালনের মাজার, গেটসহ সব কিছু ধুয়ে-মুছে পরিস্কার করে সাদা রঙ্গে আচ্ছাদিত করা হয়েছে। এর কোন তম নেই। তার পর যত কিছুই হোক না কেন, সাধু-গুরুরা আসবেই। গতকাল রবিবার লালন অডিটোরিয়ামের নিচে বাউল সাধুদের অনেক ভিড় লক্স্য করা গেছে।
উৎসব মানেই সাধু-গুরুদের এক ধরণের অন্যরকম অনুভুতির সৃষ্টি হয়। তবে মাহে রমজানের মধ্যে উৎসব হওয়ায় সে আমেজ-অনুভুতি না নিতে পারলেও হৃদয়ের অনুভুুতি নিতে ভুল করবেন না তারা।কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় বাউল স¤্রাট লালন শাহের আখড়বাড়ীতে এদিকে একদিন ব্যাপী দোল পুর্ণিমা উৎসবকে সফল ও নিরাপদ করতে জেলা আইনশৃংলা কোর কমিটির বিশেষ সভা অনুষ্টিত হয়েছে। রবিবার দুপুরে লালন মাজার চত্বরে একাডেমী ভবনে লালন একাডেমীর সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোঃ ইকবাল হোসেনের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় উৎসবকে সফল ও নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের বিভিন্ন দিক নিদের্শনা প্রদান করা হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন, বাউল সাধুরা তাদের দোল উৎসবের যে করণ-কারণ আছে তা করবেন জেলা প্রশাসন তাদের সর্বচ্চ নিরাপত্তা দেয়ার ব্যবস্থা করবে।
পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশীও গোয়েন্দা নজরদারীত্বে থাকবে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মোঃ জসিম উদ্দিন। এদিকে উৎসকে কেন্দ্র করে একদিন আগেই পুরো লালন মাজার প্রাঙ্গন সাধু-গুরুদের পদচারণায় ভরে উঠেছে। আজ ২মার্চ দুপুর ২টায় লালন অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভার মধ্যদিয়ে উৎসবের উদ্ধোধন হবে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, লালন সাঁই এর স্মরণোৎসব-২০২৬ উদযাপন কমিটির সাথে নিয়োজিত কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।


