এনএনবি : অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা দুদক অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন আইন নতুন করে সংশোধনের খসড়া করছে দুদক। এতে দেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশে দুর্নীতি, অর্থপাচার বা দুদক আইনের তফসিলভুক্ত অপরাধ সংঘটন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নাগরিক হোন বা না হোন, তাকে আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। গোপনীয় অনুসন্ধান, এনফোর্সমেন্ট অভিযান, গোয়েন্দা কার্যক্রম, এজাহার দায়ের, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং কমিশনশূন্য অবস্থায় সচিবের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও খসড়ায় যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুদকের সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম গণমাধ্যমকে বলেছেন, দুদক আইন সংশোধনের কোনো আনুষ্ঠানিক কাজ এখনও শুরু হয়নি; তবে নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় চলছে।
তিনি বলেন, “আমরা অনানুষ্ঠানিকভাবে সবসময় তৈরি থাকি। সেভাবে কাজ করছিলাম। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছু করিনি।” মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা এসেছে কি না জানতে চাইলে খালেদ রহীম বলেন, “না, সেরকম কোনো নির্দেশনা নেই। আমরা নিজেদের থেকেই মাঝে মধ্যে মতবিনিময় করি। “আগেও করেছি, এখনও করি। সেরকম ভাবেই এ বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে।”
দুদকের আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, বাতিল হওয়া অধ্যাদেশে থাকা কিছু বিধান নতুন আইনে যুক্ত করার চিন্তা থেকেই খসড়া তৈরির আলোচনা চলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “কিছু ভালো বিষয় ছিল। সরকার চাচ্ছে, সেগুলো যদি অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেজন্য নতুন আইন করবে।” অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ ১৬টিকে সংসদে বিল আকারে না এনে পরে আরও যাচাই-বাছাই করে নতুন করে আনার সুপারিশ করে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ পুনরায় বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে আইন না হলে অধ্যাদেশ ‘ল্যাপস’ হয়ে যায়। দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাতিল অধ্যাদেশের সব বিধান নতুন খসড়ায় রাখা হচ্ছে না। সরকার যেসব বিধান প্রয়োজনীয় মনে করছে, সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা থেকে সংশোধনী খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। বিদেশে থাকা ব্যক্তিও আইনের আওতায় প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য এই আইন প্রযোজ্য হইবে।” এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক না হলেও বাংলাদেশে অবস্থান করে অথবা বাংলাদেশের বাইরে থেকে দেশের অভ্যন্তরে এই আইন ও তফসিলে উল্লিখিত অপরাধ করলে তার ক্ষেত্রেও আইনটি প্রযোজ্য হবে। দুদক কর্মকর্তাদের মতে, অর্থপাচার, বিদেশে সম্পদ গঠন, ডিজিটাল লেনদেন এবং দেশের বাইরে থেকে সরকারি সম্পদ বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে এই বিধান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সংজ্ঞায় বিদেশে থাকা সম্পদও খসড়ায় ‘সম্পত্তি’র সংজ্ঞা বিস্তৃত করা হয়েছে। এতে দেশে বা দেশের বাইরে থাকা দৃশ্যমান, অদৃশ্যমান, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নগদ টাকা, ইলেকট্রনিক বা ডিজিটালসহ যে কোনো প্রকৃতির দলিল বা ইনস্ট্রুমেন্ট, যা কোনো সম্পত্তির মালিকানা বা মালিকানায় স্বার্থ নির্দেশ করে, তাও সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে। যুক্ত হচ্ছে গোপনীয় অনুসন্ধান সংশোধনী খসড়ায় ‘গোপনীয় অনুসন্ধান’ বা আন্ডারকাভার ইনকোয়ারির সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অন্য আইনের বিধান সাপেক্ষে নিজের পরিচয় গোপন রেখে কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ বা প্রাপ্ত তথ্য বা বার্তা পর্যবেক্ষণ, প্রমাণ সংগ্রহ এবং তার সত্যতা উদ্ঘাটনের জন্য কমিশন বা কমিশন ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি এ ধরনের অনুসন্ধান চালাতে পারবেন।
দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইকে অনুসন্ধান এবং অভিযোগ গৃহীত হওয়ার পর সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কার্যক্রমকে তদন্ত হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। মানি লন্ডারিংসহ আর্থিক অপরাধের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব খসড়ায় দুদকের ক্ষমতা ও কাজের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
বর্তমানে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর অধীন ঘুষ ও দুর্নীতির অপরাধ দুদকের এখতিয়ারে রয়েছে। সংশোধনী খসড়ায় সরকারি সম্পদ ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতারণা, জালিয়াতি, দলিল দস্তাবেজ জালকরণ, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার, শুল্কসংক্রান্ত অপরাধ, করসংক্রান্ত অপরাধ এবং পুঁজিবাজারসংক্রান্ত অপরাধ দুদকের এখতিয়ারে আনার সুপারিশ রয়েছে। মেয়াদ চার বছর, অযোগ্যতায় বিদেশি নাগরিকত্ব
বর্তমান আইনে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মেয়াদ পাঁচ বছর। সংশোধনী খসড়ায় তা কমিয়ে চার বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। কমিশনার হতে আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার বা শৃঙ্খলা বাহিনীতে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি নেওয়া, অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করাও কমিশনার হওয়ার অযোগ্যতার কারণ হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। ১২০ দিনের তদন্তসীমা থাকছে না দুদক আইনের ২০ক ধারায় তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। খসড়ায় এই বাধ্যবাধকতা বাতিল করে নতুন ধারা প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। জটিল অর্থপাচার, বিদেশি লেনদেন, সম্পদ অনুসন্ধান ও নথি সংগ্রহে নির্দিষ্ট সময়সীমা তদন্তে বাধা তৈরি করে বলে দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্য।
তবে সময়সীমা তুলে দিলে তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।
কমিশন খালি থাকলে সিদ্ধান্ত নেবেন সচিব খসড়ায় কমিশনশূন্য অবস্থায় দুদকের কার্যক্রম চালু রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দুদক আইনের ১০ ধারায় নতুন উপধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, অনিবার্য কারণে কমিশনের সার্বিক শূন্যতা দেখা দিলে বিশেষ প্রয়োজনে কমিশনের কার্যক্রম চালু রাখতে কমিশনের সচিব মহাপরিচালকদের সঙ্গে সভায় আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কমিশন গঠনের পর সচিবের নেওয়া কার্যক্রম কমিশনকে জানাতে হবে। এই উপধারার অধীনে সচিবের নেওয়া সিদ্ধান্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে।


