এনএনবি : বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের প্রতিটি খাতকে ‘ভঙ্গুর’ অবস্থায় পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল ও পদ্মা সেতু প্রকল্পে ‘ব্যাপক দুর্নীতি’ হওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। সোমবার দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের এক সভায় কথা বলছিলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি, আমরা প্রায় প্রত্যেকটি সেক্টর খুব ভঙ্গুর অবস্থায় পেয়েছি। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যখন সরকার যাত্রা শুরু করে, সেরকম একটা অবস্থার মধ্যে আমরা দেশটাকে পেয়েছি।” গত ৫ মে বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নূরুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ২০২১-২২ অর্থবছরের ৩৮টি নিরীক্ষা প্রতিবেদন তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কয়েক দিন আগে আমার কাছে অডিটর জেনারেল সাহেব এসেছিলেন। আমি বাস্তবতা তুলে ধরছি, কাউকে রাজনৈতিকভাবে দোষারোপ করছি না। এদেশের নাগরিকÑ আমরা, আপনারা, আপনাদের সন্তানরা এদেশে বড় হচ্ছেন, সেজন্যই আমি কথাগুলো তুলে ধরছি। অডিটর জেনারেল সাহেব যখন এলেন, উনি আমাকে কতগুলো প্রতিবেদন তুলে ধরলেন। কিছু কিছু পরে আমি দেখলাম পত্রিকাতেও এসছে।” তিনি বলেন, ‘‘রূপপুর প্রকল্প সম্পর্কে উনি বলেছিলেন, সেখানে ফুল ফার্নিশ কোয়ার্টার তৈরি করা হয়েছে বিদেশিদের জন্য। সেখানে বালিশ যখন কেনা হয়েছে, সেই বালিশের দাম ধরা হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। আপনি একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে চিন্তা করতে পারেন, কখনো কোনো বালিশের দাম পৃথিবীতে ৮০ হাজার টাকা হতে পারে! সেখানে ফার্নিচার যেহেতু ছিল, ড্রেসিং টেবিল কেনা হয়েছে, এটি অডিটর জেনারেল সাহেবের কথা। যে ড্রেসিং টেবিল উনার ধারণা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা দাম, সেই ড্রেসিং টেবিলের দাম ধরা হয়েছে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা।” প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘একটি টানেল করা হয়েছে, টানেলটির নাম কর্ণফলী টানেল। টানেলটির আমি দেখিনি, টানেলটি পার হয়ে ওপারে বোধহয় একটি জায়গায় কতগুলো খুব স্ট্যান্ডার্ড বেশ লাক্সজারিয়াস অ্যাপার্টমেন্ট বা বিল্ডিং তৈরি করা হয়েছে, যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। সেখানে কয়েকশ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অডিটর জেনারেলের ইনভেস্টিগেশনে বেরিয়ে এসেছে যে, কর্ণফলী টানেল বের হওয়া বা বা ঢোকার আগে দুপাশে গাছ লাগানোর কথা। উনি কোনো গাছ পাননি। এই গাছের জন্য ৫০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে চলে গেছে।” আরেকটি দুর্নীতির উদাহরণ তুলে ধরতে গিয়ে পিরোজপুরের প্রসঙ্গ টানেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “পটুয়াখালীর রাস্তাঘাট মানুষের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে, সেজন্য উনারা (স্থানীয় সংসদ সদস্য) এসেছিলেন যে, কী করে কাজ শুরু করা যায়। আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে, সেখানে শুধু এক মন্ত্রণালয় থেকে ৩৫ হাজার কোটি নাই হয়ে গিয়েছে শুধু কাগজ দেখিয়ে; কোনো কাজ হয়নি।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে, ঘটনাগুলো ঘটেছে। বাস্তবতা বাস্তবতাই; আমরা চাইলেও বাস্তবতাকে পাশ কাটাতে পারব না। এসব কথা বলার কারণ হচ্ছে, আপনারা আপনাদের কতগুলো সমস্যার কথা বলেছেন। আবাসন সমস্যার কথা বলেছেন, ট্রান্সপোর্টেশনের কথা বলেছেন, আপনারা আইটির জন্য, যেটা এখানে একটি নতুন ইউনিটের কথা বলেছেন, এগুলোর জন্য অর্থ প্রয়োজন। দেখুন, আমি বা মন্ত্রী সাহেব, আমরা যেই দায়িত্বে বসে আছি, আমরা কিন্তু চাই আপনাদের এই সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য, অন্তত এড্রেস করার জন্য আমরা চাই।” প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা কাজগুলো করতে চাইছি। কিন্তু এই যে চার গুণ দামে রূপপুর রিয়েক্টর তৈরি করা হলো, এটির পয়সার যে ঋণ, যেটা শোধ করতে প্রত্যেকটা মানুষের মাথার উপরে এসে ঋণ পড়েছে। পদ্মা ব্রিজে খরচ হয়েছে ৫৪ বা ৫৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আল্টিমেটলি তো এখানে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষসহ ২০ কোটি মানুষের উপরে এই ঋণের বোঝা এসে পড়ছে। আজ যদি এই অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো না হতো, তাহলে আপনাদেরসহ আর্মি বলেন, এয়ারফোর্সে বলেন, নেভি বলেন, শিক্ষা বলেন, স্বাস্থ্য বলেন, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আমরা আরো বেটার কিছু করতে পারতাম।” তারেক রহমান বলেন, কারো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী অবস্থান দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে থেমে গেলে চলবে না। যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা আইনের লোক, কোনো বিশেষ দলের নন। কারো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী পরিচয় দেখে থমকে যাবেন না। যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই গণ্য করবেন।’
দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার আপসহীন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রথম কাজ। পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি পদই গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র পদোন্নতি বা পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য তদবির করা পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করার নামান্তর।
তিনি বলেন, ‘হয়তো চাহিদামতো পোস্টিং পেলে আপনি সাময়িকভাবে তুষ্ট হবেন, কিন্তু এটি আপনার পেশাদারিত্বের ক্ষতি করে। যার যেখানে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, সেখানেই গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করুন।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সরকার যেমন পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত, তেমনি প্রশাসনের কোনো পদই কারো জন্য চিরস্থায়ী নয়। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন পাল্টে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পুলিশিং আর কেবল শহর বা জেলার গ-িতে সীমাবদ্ধ নেই। ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম (আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধ)’ এখন বড় বাস্তবতা। কয়েক দশক আগের তুলনায় বর্তমানের চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি বিস্তৃত। তাই প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হতে হবে। সময়ের এই দাবি পূরণ করতে না পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা- বরদাস্ত করা হবে না। দেশের সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করা পুলিশের নৈতিক দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের উদাহরণ টেনে মিতব্যয়িতার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্যাবিনেটে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মন্ত্রীদের জ্বালানি তেলের বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার। আমি নিজেও খরচ কমানোর চেষ্টা করছি।’ তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা যারা এই ঘরে বসে আছি, তারা ২০ কোটি মানুষের তুলনায় অনেক বেশি প্রিভিলেজড (সুবিধাভোগী)। আসুন, আমরা আমাদের সেই সুবিধা কিছুটা ত্যাগ করি। আমরা একটু একটু করে ছাড় দিলে রাষ্ট্র অনেক বড় সাশ্রয় করতে পারবে।’ প্রধানমন্ত্রী জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে নিয়োগ ও বদলির একমাত্র মাপকাঠি। পুলিশের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে সব সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আশ্বাস দেন তিনি। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহের স্লোগানÑ ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ’Ñ সার্থক করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আসুন, আমরা আমাদের অবস্থান থেকে দেশকে কতটুকু দিতে পারি, সেই শপথ নিই।’
শাপলা হলের এই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


