এনএনবি : খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত উভয় খাতেই পণ্যের দাম বাড়ায় একমাসের ব্যবধানে ফের ৯ শতাংশ ছাড়াল সার্বিক মূল্যস্ফীতি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে যে মূল্যস্ফীতি ফের চাঙ্গা হচ্ছে, এ তথ্য সে বার্তাই দিল। টানা কয়েক মাস বেড়ে নির্বাচনের মাস ফেব্রুয়ারিতে ৯ শতাংশের ঘরে পৌঁছে যাওয়া মূল্যস্ফীতির হার এক মাসের ব্যবধানে মার্চে এসে ৮ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছিল। এবার এপ্রিলে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সেই মূল্যস্ফীতি গিয়ে দাঁড়াল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। বুধবার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এক মাস আগে, অর্থাৎ মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে বোঝায়, গত বছর এপ্রিল মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছরের এপ্রিলে পেতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ০৪ পয়সা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যসহ সকল দ্রব্যের দাম বাড়ার আশঙ্কার কথা আগেই বলেছিলেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসে দাম বেড়েছে খাদ্যপণ্যে ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই। তাও বেশ বড় ব্যবধানে।
এপ্রিলে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্য বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে এপ্রিলে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় টানা চতুর্থ মাস মূল্যস্ফীতি বেড়ে ফেব্রুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠেছিল। মূল্যস্ফীতির এই হার গতবছরের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। ওই সময় এ হার ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। মে মাসে তা কমে ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছিল। এরপর তা কমতে কমতে গতবছর অক্টোবর মাসে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা ৩৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম।
এরপর থেকে ফের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির পারদ। গতবছর নভেম্বরে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশের পর জানুয়ারিতে এই হার ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছায়। ফেব্রুয়ারিতে তা এক লাফে ৯ শতাংশে পৌঁছানোর পর ফের মার্চে ৮ শতাংশের ঘরে আসে মূল্যস্ফীতি। তবে এক মাসের ব্যবধানেই ফের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির পারদ। এপ্রিলে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৫ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি মার্চের ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে এপ্রিলে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০২ শতাংশে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামান্য বেড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের মজুরিও।
মার্চে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা এপ্রিলে এসে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। মজুরি সামান্য বাড়লেও তা এখনও মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেশি বাড়ার কারণ হল জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি।
একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর সকল পণ্যেরও দাম বাড়ায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বলেন তিনি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়ার বিষয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “এটার মধ্যে শুধু জ্বালানি তেল না, অন্যান্য সব আমদানিনির্ভর জিনিসেই তো বেড়েছে। যদিও মূল্যস্ফীতি কমার কোনো লক্ষণ আগেও ছিল না, সংকট তৈরি হওয়ার আগেও ছিল না। কিন্তু এই মার্চ মাসের ভিত্তিটা ‘ডিটেইল’ থেকে যদি দেখেন, এটা সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি।” খাদ্যবহির্ভূত খাতের বৃদ্ধি নিয়ে তিনি বলেন, “খাদ্যবহির্ভূতর মধ্যেই তো জ্বালানিটা। যদিও আমাদের বিদ্যুতের দামে কোনো সমন্বয় হয়নি, কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়ার সাথে সাথে তো পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। ‘আদতে সরকারিভাবে দাম বাড়ানোর আগেই, কিন্তু বাজারে জ্বালানির দাম এমনি বেড়ে গেছিল।” ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার চড়তে থাকার মধ্যে গেল ১৮ এপ্রিল চার ধরনের তেলের দাম বাড়ায় সরকার। তখন ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মে মাসে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়ে। আয় না বাড়লে তাদের সংসার চালানের খরচ বেড়ে যায়।
গত দুই সপ্তাহে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে শাকসবজির দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। মাছ-মাংসের দামও বাড়তি। তবে চালের দাম স্থিতিশীল আছে।
গত এপ্রিল মাসে জাতীয় গড় মজুরি হার হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর মানে হলো, যত মূল্যস্ফীতি হয়েছে, এর চেয়ে মজুরি কম বেড়েছে। ফলে বাজার থেকে পণ্য কিনতে ভোগান্তি বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয় কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হয়।


