কাগজ প্রতিবেদক ॥ কুষ্টিয়া মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা মুক্তি দিয়ে ৩১ ঘন্টা পর গতকাল শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেল ৫টায় শহরের হাউজিংস্থ চাঁদাগাড়ার বাড়ি ফিরেছে বলে পরিবার নিশ্চিত করেছে। তবে বিষয়টি রহস্যজনক ও ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টায় ওই ব্যাংক কর্মকর্তা নিঁেখাজ হন বলে পরিবার থেকে থানায় সাধারন ডায়েরি করা হয়। পরে একাধিক ফোন থেকে মুক্তিপণ চাওয়া হয় পরিবারের কাছে। ব্যাংক কর্মকর্তার মুক্তি দেওয়ার কথা বলে দুই দফায় পরিবারের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাঙ্কিংয়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে। তবে তার অপহরণ, ফিরে আসা ও অর্থ লেনদেনের ঘটনায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ ও র্যাবের টিম। তারাও নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
জানা যায়, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক কুষ্টিয়া শাখার কর্মকর্তা সাঈদ হাসান শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে হাউজিং এস্টেট এর বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। এরপর সাঈদ হাসানের স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার কুষ্টিয়া মডেল থানায় জিডি করেন (যার নং-১৫৫৭, তাং-২৪/০৪/২০২৬)। এরপর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এর মাঝে শনিবার সকাল ৬টার দিকে (০১৯০৮৬৭৯৯৬৪) এই নম্বর থেকে সাঈদের ফুফাতো ভাইয়ের কাছে মুক্তিপণের দাবিতে কল আসে। মাত্র ১৭ সেকেন্ড কথা হয়। দাবিকৃত টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেয় তারা। এদিকে সুরাইয়া আক্তার পুলিশের পাশাপাশি কুষ্টিয়া র্যাব ক্যাম্পে আলাদা একটি অভিযোগ দিতে আসে শনিবার দুপুরে। র্যাব ক্যাম্পে অবস্থান করাকালীন সময় একটি নম্বর থেকে ফোন আসে মুক্তিপণের দাবিতে। তবে বিষয়টি র্যাবকে না জানিয়ে পরে ক্যাম্প থেকে চলে যান সুরাইয়া। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, প্রথমে যে নম্বর থেকে কল এসেছিল সেটি লোকেশন ছিল কিশোরগঞ্জ। ব্যাংকার সাঈদ নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার তার সন্ধান চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছবিসহ তথ্য শেয়ার করে। বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। দেশের কোন প্রতারক চক্র বিষয়টি টের পেয়ে অপহরণকারী সেজে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে এমন ধারনা করা হচ্ছে। তারপরও আমরা বিষয়টি বের করার চেষ্টা করছি।
এদিকে দুপুরে র্যাবের কাছে অভিযোগ করার পর র্যাবও নড়েচড়ে বসে। তারা প্রযুক্তির মাধ্যমে সনাক্ত করার চেষ্টা করে। র্যাবের কুষ্টিয়া ক্যাম্পের কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত সরকার জানান, আমাদের কাছে এসেছিল সুরাইয়া আক্তার। আমাদের কাছে অভিযোগ আনার কয়েক ঘন্টা পরই সাঈদ হাসান বাড়ি ফিরেছে বলে জানতে পারি। আমরা সুস্থ হলে তার সাথে কথা বলব।’
সাঈদের স্ত্রী সুরাইয়া জানান, মুক্তিপণ চেয়ে কল দেওয়া হয়। এরপর তারা দ্রুত দুই লাখ টাকা দাবি করে। ১ লাখ টাকা পেলে তারা আমার স্বামীর কন্ঠ শোনাবে বলেও জানায়। আমরা টাকা ম্যানেজ করার জন্য সময় চাই। পরে আমরা ১ লাখ টাকা মোবাইল ব্যাঙ্কিং রকেটে পাঠায়। এরপরও স্বামীর সাথে আমাদের কোন কথা বলায়নি তারা। ১ লাখ টাকা পাওয়ার পর আরো অর্থ দাবি করে। পরে আমরা আরো ৫০ হাজার টাকা পাঠায়।
সুরাইয়া বলেন, আমরা ভয়ে পুলিশকে জানায়নি টাকা দেওয়ার বিষয়টি। আমার স্বামীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই আমরা টাকা দিয়েছি। তার সাথে মোবাইল থাকলেও সেটির কোন খোঁজ পাচ্ছি না। গতকাল শনিবার বিকেল ৫টার দিকে স্বামী বাড়ি ফিরেছে জানিয়ে বলেন, নাটোর জেলা বা আশেপাশের কোথাও তাকে আটকে রাখা হয়েছিল। পরে বাসে উঠিয়ে দেওয়া হলে সে মজমপুর গেইটে এসে নামে। শহরে আমার এক আত্মীয়র দোকান থেকে বাড়িতে ভিডিও কল দেয়। এরপর আমরা গিয়ে বাসায় নিয়ে আসি। মানসিকভাবে সে বিধস্ত। তবে শারিরীক ভাবে তাকে মারধর করা হয়নি। তাকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে। তবে কাউকে তিনি চেনেননি বলে সাঈদের স্ত্রী জানান। তাহলে অর্থ কাকে দেওয়া হলো জানতে চাইলে বলেন, আমাদের কাছে মোবাইলের মাধ্যমে অর্থ নেওয়া হয়েছে। কারা নিল তা বুঝতে পারছি না।
ব্যাংকার সাঈদ হাসান ফিরে আসার তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে হাউজিংস্থ বাসা থেকে বের হয় শহরের উদ্দেশ্যে। সে একটি অটোবাইকে করে শহরে যাচ্ছিল। অটোতে আগে থেকেই একজন যাত্রী বসা ছিল। সাঈদ হাসান অটোতে ওঠার পর তার পাশের যাত্রী ঠিকানা জানতে তাকে একটি সাদা কাগজ দেয়। সাঈদ হাসান সেটি চোখের সামনে নিতে ওই যাত্রী কাগজটিতে টোকা মারেন এতে তিনি সজ্ঞাহীন হয়ে পরেন। পরে তিনি বুঝতে পারেন তাকে একটি কক্ষে রাখা হয়েছে। দুপুরের পরে নাটোর থেকে কুষ্টিয়াগামী যাত্রীবাহী বাসে তাকে তুলে দেয়া হয়। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, অপহরণ না কি অন্য কোন ঘটনা আছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাঈদের সাথে বলে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হবে। পুলিশ কাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে। অর্থ লেনদেনের বিষয়টি তাদের জানানেই। পরিবার থেকেও বিষয়টি তাদের জানানো হয়নি। পুলিশ জানায়, সাঈদকে কুষ্টিয়া থেকে কেউ অপহরণ করেছে না কি অন্য কোন ঘটনা আছে সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনেক সময় শয়তানের নি:শ্বাস বা অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে। সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি কবির হোসেন মাতুব্বর জানান, সাঈদ নিখোঁজ হওয়ার পর জিডি করে পরিবার। এরপর তদন্ত শুরু হয়। মোবাইলে মুক্তিপণ চেয়ে যে নম্বর থেকে ফোন আসে সেটি ছিল কিশোরগঞ্জের। তাই কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সাঈদকে বিকেলে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাসে করে সে মজমপুরে নেমে বাড়িতে ফিরেছে। তার সাথে পুলিশ কথা বলে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।’


