আন্তজার্তিক ডেক্স ॥ দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে চলমান আলোচনার প্রেক্ষিতে একটি বড় ধরনের ‘ব্রেকথ্রু’ বা সমঝোতার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। কূটনৈতিক এই তৎপরতার অংশ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল রাতে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে ইসলামাবাদ সফরে যান। এর আগে আজ দিনের শুরুতে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দারের সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘ আলাপ করেন আরাগচি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দুই নেতা আঞ্চলিক পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পৃক্ততার প্রেক্ষাপটে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ‘ধারাবাহিক ও গঠনমূলক মধ্যস্থতাকারী’ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গেও টেলিফোনে কথা বলেছেন।
ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের একটি লজিস্টিক ও সিকিউরিটি টিম অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, শনিবারের মধ্যেই ওয়াশিংটনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছাতে পারে। ইসলামাবাদে এই সম্ভাব্য আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কে নেতৃত্ব দেবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গত দফার আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স অংশ নিয়েছিলেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের মাটিতে এই আলোচনা সফল হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে এক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।
জাতীয় ঐক্যই শত্রুপক্ষের জন্য বড় আঘাত : ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মোজতবা খামেনি বলেছেন, ইরানের জনগণের অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য ও সংহতি শত্রুপক্ষকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই ঐক্যের কারণেই শত্রুদের প্রতিটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘দেশপ্রেমিক ইরানিদের মধ্যে যে বিস্ময়কর সংহতি তৈরি হয়েছে, তা শত্রুদের শিবিরে ফাটল ধরিয়েছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই ঐক্য শত্রুদের সমস্ত হিসাব-নিকাশ ও পরিকল্পনা ওলটপালট করে দিয়েছে।
ভারতের পথে থাকা ২ জাহাজ জব্দ করল আইআরজিসি : কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে চরম উত্তেজনার মধ্যে দুটি বিশাল কন্টেইনার জাহাজ জব্দ করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। জব্দকৃত জাহাজ দুটির মধ্যে ‘এপামিনন্ডাস’ নামক ভেসেলটি ভারতের গুজরাট বন্দরের দিকে যাচ্ছিল বলে জানা গেছে। ইরানি সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক জাহাজ ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, বুধবার সকালে আইআরজিসি নেভি এই অভিযান চালায়। আটককৃত দ্বিতীয় জাহাজটির নাম ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’, যা পানামার পতাকাবাহী এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। আইআরজিসি-র এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, জাহাজ দুটি প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই এবং নেভিগেশন সিস্টেম বা জিপিএস ট্র্যাকিং বন্ধ করে ‘গোপনে’ হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। ইরানের দাবি, জাহাজগুলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিঘিœত করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত করছে পেন্টাগন : ইরানের সমুদ্রবন্দরের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ-অবরোধ এখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হচ্ছে বলে ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। আজ এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনীর অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালী দিয়ে এখন কোনো জাহাজ বিশ্বের কোথাও চলাচল করতে পারবে না। সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ বলেন, ‘ইরানের ওপর আমাদের নৌ-অবরোধ কেবল জোরালো হচ্ছে না, বরং এটি এখন বৈশ্বিক রূপ নিচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, অবরোধ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ওই অঞ্চলে আরও একটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করা হবে।
আরও তিন সপ্তাহ বাড়ল ইসরাইল-লেবানন যুদ্ধবিরতি : ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত আসে, যা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, বৈঠকটি ‘খুবই ফলপ্রসূ’ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের সঙ্গে কাজ করে দেশটিকে হিজবুল্লাহর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, এই প্রক্রিয়া বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ, যার মধ্যে ইরান সম্পর্কিত উদ্যোগও রয়েছে।
ফুরিয়ে যাচ্ছে অস্ত্র ভা-ার, সংকটে যুক্তরাষ্ট্র : মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের জেরে মারাত্মক গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘাটতি দেশটির সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক কঠিন দ্বিধা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র উপদেষ্টা এবং অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্পস কর্নেল মার্ক এফ. কানসিয়ান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনেক ধরনের গোলাবারুদের পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও, কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রাউন্ড-অ্যাটাক এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যুদ্ধের আগেই কম ছিল, যা এখন আরও প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।” নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই ঘাটতি এশিয়া অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং সামরিক সক্ষমতার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক পৃথক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের সাথে উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ১,০০০-এর বেশি দূরপাল্লার ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এছাড়া থাড এবং প্যাট্রিয়টের মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে যে পরিমাণ অস্ত্রের মজুদ শেষ হয়েছে, তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে বা সম্পূর্ণ পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয় বছর সময় লেগে যেতে পারে। এ অবস্থায় একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সুরক্ষা দেওয়া এবং অন্যদিকে এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ওয়াশিংটনের জন্য বড় এক সামরিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র : তাসনিম, আল-জাজিরা, নোটাস, রয়টার্স।


