এনএনবি : বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ তুলে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি দিলেও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ।
আলাদা দুটি বিল পাসের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে এ দুটি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হয়। আর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। ফলে আপাতত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো আইন থাকছে না। সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত ভিত্তিও থাকছে না। বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম আগের কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি হল যেভাবে বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি কয়েক যুগ ধরে বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছিল। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও সভা-সমাবেশের মধ্যে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন। সেই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেয়। সেই রায়ের ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ গত বছর ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সররকারের অনুমোদন পায়। তার ১০ দিনের মাথায় ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি হয়।
এ অধ্যাদেশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর নি¤œ আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটির পাশাপাশি নি¤œ আদালতের বিচারকদের নিয়োগের সব কিছু সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় করবে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ’ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব সংসদে তোলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তখন আপত্তি জানান বিরোধী সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান। পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এই সদস্য বলেন, “বিলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন।” তার ভাষায়, “ফ্যাসিবাদী কায়দায় নি¤œ আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমনের আয়োজন চলছে।” আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ- দ-িত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাজিবুর রহমান বলেন, বিচার বিভাগ এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় কিছু বিচারককে শোকজও করা হয়েছে। তিনি বলেন, আগে মন্ত্রণালয়ের কথা না শুনলে বিচারকদের দূরবর্তী জেলায় বদলি করা হতো, এখন সেই পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। জামায়াতের এ সদস্য বলেন, হাইকোর্টের একটি রায়ের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। তার ভাষায়, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে আনা পরিবর্তন অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে এবং মূল ১১৬ অনুচ্ছেদ ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত’ হয়েছে। সে অনুযায়ী বিচারিক কার্যসম্পাদনকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। নাজিবুর রহমান বলেন, “সে রায় বাস্তবায়িত হয়ে গিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। সেখানে রায়টি স্থগিত হওয়া কিংবা বাতিল হওয়া ছাড়া এটিকে বিলুপ্ত করা, সেই সচিবালয়কে বিলুপ্ত করার জন্য বিল আনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং আদালত অবমাননার শামিল।” এই সদস্য বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোরও প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “রহিতকরণ বিলটি অসাংবিধানিক। এটা কোনোভাবেই পাস করা যাবে না।” নাজিবুর রহমান বলেন, সংসদ সার্বভৌম বলে আদালতের রায় না মানার যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তা জনমত বিভ্রান্ত করছে।
তিনি একটি বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের কেউই সার্বভৌম নয়; সংবিধানের সীমার মধ্যেই তাদের কাজ করতে হয়। তার ভাষায়, কোনো আইন সংবিধানবিরোধী হলে আদালত সেটি বাতিল করতে পারে। বিরোধী দলের এ সদস্য বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়নি। সে অবস্থায় এখন রহিতকরণ বিল আনা জনগণের সঙ্গে ‘প্রতারণার’ শামিল। জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না, তা বলতে পারে; কিন্তু সংসদকে কোনো আইন করতে ‘ডিক্টেট’ করতে পারে না। মাসদার হোসেন মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আদালত আইন নিয়ে মত দিতে পারে, কিন্তু আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় এবং তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জামায়াতের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা চাই। ওনাদের পিতারা বিচার বিভাগের কাছে অবিচারের শিকার হয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতা যেমন অ্যাবিউজড হয়েছে, যারা সে বিচার করেছিলেন তারা সবচেয়ে স্বাধীন বিচারক ছিলেন।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিচারকদের চাকরি, বদলি, পদায়ন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সুরক্ষা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত।
তবে তার ভাষায়, সেই সুপ্রিম কোর্ট থেকেই ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ এর জন্ম হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিচারের অভিযোগও উঠেছে। খালেদা জিয়ার সাজার প্রসঙ্গ টেনে আসাদুজ্জামান বলেন, “সে সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেত্রী, গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, বাংলাদেশের হৃৎপি- বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছর থেকে ১০ বছর জেল দিয়েছিলেন।” রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ চালানোর অভিযোগও তোলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট একজন বিচারকের বিরুদ্ধেও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেয়নি।


