এনএনবি : দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের পৃথক দুই হামলার ঘটনায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহতরা সবাই ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্য। গত শনি, রোববার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় লেবানিজ সাংবাদিক ও চিকিৎসকদের প্রাণহানির পর এবার শান্তিরক্ষী বাহিনীও (ইউনিফিল) তাদের প্রাণঘাতী হামলার শিকার হলো। শান্তিরক্ষী বাহিনী ইউনিফিল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সোমবার দক্ষিণ লেবাননের বানি হাইয়ানের কাছে একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে আসা গোলার বিস্ফোরণে তাদের একটি গাড়ি ধ্বংস হলে দুই শান্তিরক্ষী নিহত হন। এই ঘটনায় আরও দুই সেনা আহত হয়েছেন। এর আগে রোববার দিবাগত রাতে দক্ষিণ লেবাননের আদচিত আল-কুসাইর গ্রামের কাছে একটি গোলার বিস্ফোরণে আরও এক ইন্দোনেশীয় শান্তিরক্ষী নিহত হন। সে সময় আরেকজন শান্তিরক্ষী গুরুতর আহত হন। গত ২ মার্চ ইসরায়েল এবং লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম শান্তিরক্ষী বাহিনীর কোনো সদস্য নিহত হলেন। ইউনিফিলের মুখপাত্র ক্যান্ডিস আরদিয়েল বলেন, “এগুলি পৃথক ঘটনা এবং আমরা এগুলোকে আলাদাভাবেই তদন্ত করছি।” প্রথম মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের একজন নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং অন্য তিনজন ‘পরোক্ষ কামানের গোলায়’ আহত হয়েছেন। ইন্দোনেশিয়া এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মঙ্গলবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দক্ষিণ লেবাননের দ্রুত অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিফলন, যেখানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।”
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুগিওনো জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে কথা বলে এই ‘জঘন্য হামলার’ দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ঘটনা দুটি সম্পর্কে অবগত এবং এগুলো হিজবুল্লাহ নাকি তাদের নিজস্ব বাহিনীর কারণে ঘটেছে তা খতিয়ে দেখছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং এটি যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। নিহত হচ্ছেন চিকিৎসক ও সাংবাদিকরা দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে ইউনিফিল।
গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত ১,২৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ১২০ জনের বেশি শিশু, প্রায় ৮০ জন নারী এবং বেশ কয়েকজন চিকিৎসক রয়েছেন। হিজবুল্লাহর সূত্রের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে তাদের অন্তত ৪০০ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। সোমবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবাননের পশ্চিম বেকা অঞ্চলের ছয়টি গ্রামের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত শনি ও রোববার ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১০ জন প্যারামেডিক বা চিকিৎসক নিহত হয়েছেন। শনিবার এক গাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় তিন সাংবাদিক নিহত হন। ইসরায়েল দাবি করেছে, হিজবুল্লাহর সদস্যরা প্যারামেডিক সেজে চলাফেরা করছে এবং নিহত কিছু সাংবাদিক হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা বা সামরিক শাখার অংশ ছিল। তবে লেবানন সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, লক্ষ্যবস্তু হওয়া ব্যক্তিরা পেশাগত দায়িত্ব পালনরত বেসামরিক নাগরিক। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা সীমান্ত থেকে ৩০ কিলোমিটার উত্তরের লিটানি নদী পর্যন্ত একটি ‘বাফার জোন’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের স্থল বাহিনী ইতিমধ্যে লেবাননের সীমান্ত শহরগুলোতে প্রবেশ করে বাড়িঘর ধ্বংস করতে শুরু করেছে।
মঙ্গলবার ইসরায়েলি বাহিনী তাদের আরও চার সেনা নিহতের খবর জানিয়েছে। এ নিয়ে লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিরোধে ১০ ইসরায়েলি সেনা নিহত হল। অন্যদিকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় লেবাননের আরও একজন সৈন্য নিহত হয়েছেন। এই নিয়ে ইসরায়েলের হাতে অন্তত নয়জন লেবানিজ সৈন্য প্রাণ হারালেন। যদিও লেবানন সেনাবাহিনী যুদ্ধে সরাসরি ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে লড়ছে না।


