এনএনবি : মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের ফলে এলপিজি সরবরাহে বিঘœ ঘটায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকটে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। সরবরাহের ঘাটতি ও রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় নি¤œ আয়ের পরিবার থেকে শুরু করে হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরাও এখন বিকল্প হিসেবে কাঠ, কয়লা ও মাটির উনুনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারে বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের তীব্র আকাল দেখা দেওয়ায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাটারিং ব্যবসায়ী এবং স্ট্রিট ফুড বিক্রেতারা পড়েছেন চরম বিপাকে। ডিলারদের কাছে বারবার ধর্না দিয়েও মিলছে না প্রয়োজন অনুযায়ী সিলিন্ডার। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় জোগান তলানিতে ঠেকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে কালোবাজারির শিকার হচ্ছেন। বেশি দামে কালোবাজার থেকে গ্যাস কিনে ব্যবসা চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের দাম মধ্যবিত্তের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। মাসের শেষে হিসাবের খাতা মেলাতে গিয়ে অনেকেই এখন গ্যাস সিলিন্ডার কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ওভেনে আগুন জ্বলছে না বহু বাড়িতে। ফিরছে আগের কালের উনুন। বাধ্য হয়েই পুরোনো অভ্যাসে ফিরতে হচ্ছে মানুষকে। আধুনিক ও দূষণমুক্ত রান্নার গ্যাসের বদলে এখন পাড়ায় পাড়ায় আবারও দেখা মিলছে ধোঁয়া ওঠা মাটির উনুনের। জ্বালানির দোকানগুলোতে কয়লা এবং জ্বালানি কাঠের চাহিদা অনেকটাই বেড়ে গেছে। নি¤œবিত্ত পরিবারগুলোতে ঘুঁটের ব্যবহার আবার শুরু হয়েছে। হোটেল বা চায়ের দোকানগুলোতেও ফিরে এসেছে কয়লার চুলা। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলপিজি আমদানিকারক দেশ ভারত তাদের চাহিদার সিংহভাগই মেটায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু ইরানে চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাজ্যগুলোকে কালোবাজারি রোধ করতে এবং আতঙ্কিত না হতে নির্দেশ দিয়েছেন। দিল্লির চিত্র ও স্বাস্থ্যঝুঁকি:
ভারতের রাজধানী দিল্লির মদনপুর খদর এলাকার গৃহকর্মী ৩৬ বছর বয়সী শীলা কুমারী জানান, আগে ১,৮০০-২,০০০ রুপিতে গ্যাস সিলিন্ডার মিললেও এখন কালোবাজারে এর দাম ৫,০০০ রুপি (৫৩ ডলার) পর্যন্ত উঠেছে। মাসিক মাত্র ৬,০০০ রুপি বেতনের শীলা বলেন, “আমাদের পক্ষে এটা কল্পনা করাও অসম্ভব। তাই আমরা আবার কাঠ ও কয়লায় ফিরে গেছি।” মাত্র ৩০ রুপিতে কেনা ১০ কেজি কাঠ দিয়ে তার কয়েকদিন রান্না চলে যাচ্ছে। তবে ধোঁয়ার কারণে তার সন্তানরা কাশছে বলেও তিনি জানান। শীলার প্রতিবেশী ৪৫ বছর বয়সী মুন্নি বাই, যিনি হাঁপানিতে আক্রান্ত, তিনি জানান যে, গ্যাসের দাম বেশি হওয়ায় তিনি আবার পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। অধিকারকর্মীরা বলছেন, অনেক অভিবাসী শ্রমিকের প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকায় তারা ভর্তুকিযুক্ত এলপিজি পান না এবং কালোবাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেখানে দাম বেড়ে গেছে ২-৩ গুণ। কয়লা ও কাঠের ব্যবহার বাড়ায় বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারত সরকারের ‘উজ্জ্বলা’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ কোটির বেশি পরিবারকে এলপিজি সংযোগ দেওয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতি তাদের আবার বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গতকারী জ্বালানির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে বিশেষ করে নারী ও শিশুরা বড় ধরনের শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। কাঠ-কয়লা পোড়ানোর ফলে একদিকে যেমন ব্যাপক মাত্রায় বায়ুদূষণ বাড়বে, তেমনই জ্বালানি কাঠের জন্য যথেচ্ছভাবে গাছ কাটার প্রবণতাও ফিরে আসবে। ব্যবসায়িক প্রভাব: রেস্তোরাঁর মেনু বদল বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন ও জীবিকা কঠিন হয়ে পড়েছে। দিল্লির মুঘলাই খাবারের রেস্তোরাঁগুলো জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, কলকাতার বিখ্যাত ‘বার-বি-কিউ’ এবং ‘ওয়ান স্টেপ আপ’-এর মতো রেস্তোরাঁগুলো ইন্ডাকশন উনুনে বা বৈদ্যুতিক চুলায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। গ্যাস বাঁচাতে অনেক হোটেল এখন তাদের মেনু কাটছাঁট করছে এবং শুধুমাত্র ইন্ডাকশন চুলায় তৈরি করা যায় এমন খাবার পরিবেশন করছে।


