বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০০ পূর্বাহ্ন
ইরানি মিসাইল ড্রোন আতঙ্কে ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল বেশি ঘুরে ক্রুড আনছে বিপিসি
/ ৯০ দেখা হয়েছে
বার : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৫:৪১ অপরাহ্ন

ঢাকা অফিস ॥ ইরানি মিসাইল ও ড্রোন হামলায় নাস্তানাবুদ আরব বিশ্বের মার্কিন সামরিক স্থাপনা। লোহিত সাগরেও রয়েছে ইরানি ড্রোন হামলার আতঙ্ক। ড্রোনের ভয়ে ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল বেশি পথ ঘুরে সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আনছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। সূত্র জানায়, গত ২৩ জুলাই এমটি নিনেমিয়া জাহাজটি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। জাহাজটি বর্তমানে সুয়েজ খাল অতিক্রম করে জিব্রাল্টার প্রণালির দিকে যাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাহাজটি চট্টগ্রামে আসার কথা রয়েছে। বিপিসির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির (ইআরএল) প্রয়োজনীয় আমদানি করা অপরিশোধিত তেল পরিবহন করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিএসসি। ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী এমটি নিনেমিয়া স্বাভাবিক সময়ে ৪ হাজার ২শ নটিক্যাল মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে দেশে আসে। এবার এ রুটের পরিবর্তে ১৩ হাজার ১২৯ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসবে। বিএসসির ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে লোহিত সাগর দিয়ে বাব আল মান্দেব প্রণালি হয়ে (লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল) বিপিসির আমদানি করা ক্রুডবাহী জাহাজ ভারত মহাসাগর হয়ে বাংলাদেশে আসতো।
কিন্তু লোহিত সাগর ও বাব আল মান্দেবে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঝুঁকি থাকায় রুট পরিবর্তন করে এমটি নিনেমিয়াকে সুয়েজ খাল-জিব্রাল্টার ও দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তামাশা অন্তরীপ (কেপ অব গুড হোপ) হয়ে বাংলাদেশে আসত। বিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ইয়ানবু থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব ৪২শ নটিক্যাল মাইল। ইয়ানবু থেকে অপরিশোধিত তেলের জাহাজ চট্টগ্রামে আসতে সময় লাগতো ১৩-১৫ দিন। রুট পরিবর্তনের কারণে ইয়ানবু থেকে বর্তমানে ১৩ হাজার ১২৯ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হচ্ছে এমটি নিনেমিয়াকে। এতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আরও ৩৪ দিনের মতো সময় বেশি লাগার কথা রয়েছে। পার্সেলটি বহনের ক্ষেত্রে মূল ভাড়ার পাশাপাশি ৫৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৩ ডলার অতিরিক্ত খরচের কথা জানিয়ে গত ২৩ জুলাই বিপিসিকে চিঠি দিয়েছে বিএসসি, যা বাংলাদেশি টাকায় ৬৬ কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ দশমিক ৪৬ টাকা হিসেবে)। মূলত লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে সুয়েজ খাল। এটি ইউরোপ-এশিয়ার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সমুদ্রপথ। পাশাপাশি ভূমধ্যসাগরকে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে যুক্ত করেছে জিব্রাল্টার প্রণালি। আর দক্ষিণ আফ্রিকার আটলান্টিক মহাসাগর উপকূলে অবস্থিত পাথুরে অন্তরীপ উত্তামাশা। এটিকে ‘কেপ অব গুড হোপ’ বলা হয়। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি পরিশোধন করে ইআরএল। এতে পরিশোধনে ব্যবহৃত শতভাগ অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়।
বাংলাদেশ জি টু জি পদ্ধতিতে সৌদি আরব থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মারবান ক্রুড আমদানি করে। আমদানি করা ক্রুডের শতভাগ পরিবহন করে সরকারি পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিএসসি। বিএসসির তথ্য বলছে, ২২ জুলাই লে-ক্যানে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড টনপ্রতি ১২২ দশমিক ৩১৮৪৭১ ডলারে পরিবহনের দায়িত্ব পায় এমটি নিনেমিয়া। এজন্য জাহাজটি শিডিউল অনুযায়ী ২৩ জুলাই ইয়ানবু বন্দরে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল লোড করে।
কিন্তু লোহিত সাগরে ইরানি হামলার আশঙ্কা থাকায় বাব আল মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ থাকার কথা জানিয়ে ওই দিনই বিএসসিকে ইমেইল দেয় জাহাজটির শিপিং এজেন্ট। ইমেইলে রুট পরিবর্তন করে বাব আল মান্দেবের পরিবর্তে বিকল্প রুট সুয়েজ খাল-কেপ অব গুড হোপ হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসার অনুমতি চাওয়া হয়।
এজন্য স্বাভাবিক দূরত্বের পরিবর্তে চট্টগ্রামে আসতে বিকল্প রুটে ৮ হাজার ৯২৯ নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিতে হবে বলে জানানো হয় ইমেইল বার্তায়। ইমেইল বার্তায় জাহাজ ডাইভারশন বা রুট পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত ৩৩ দশমিক ৯ দিনের জন্য ৫৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৩ ডলার খরচের একটি তথ্য ওই ইমেইল বার্তায় জানানো হয় বলে বিপিসিকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করে বিএসসি। লোহিত সাগরে যুদ্ধাবস্থার কারণে হামলার ঝুঁকি থাকায় বিকল্প রুট হিসেবে কেপ অব গুড হোপ হয়ে বাংলাদেশে আসছে এমটি নিনেমিয়া। এজন্য জাহাজ ভাড়ার অতিরিক্ত খরচের বিষয়টি বিএসসিকে ইমেইলের মাধ্যমে জানানো হয়েছে।-শিপিং এজেন্টের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হাবিবুর রহমান বিএসসির তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ২৬ দশমিক ৩ দিন বাংকারিং খরচ হিসেবে দৈনিক ৪২ দশমিক ৫ টন ভিএলএসএফও (ভেরি লো সালফার ফার্নেস অয়েল) এবং দক্ষিণ আফ্রিকার শীতকালীন খারাপ আবহাওয়ার জন্য অতিরিক্ত ৭ শতাংশ জ্বালানি হিসেবে মোট ১১৯৫ দশমিক ৯৯২৫ টন বাংকারের মূল্য ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৫৩৩ ডলার, ভূমধ্যসাগরে দৈনিক ৪২ দশমিক ৫ টন হিসেবে ৭ দশমিক ৬ দিনে ৩২৩ টন এমজিও (মেরিন গ্যাস অয়েল) বাংকারিংয়ের মূল্য ৪ লাখ ৫২ হাজার ২শ ডলার, সুয়েজ খালের টোল ৫ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং ৩৩ দশমিক ৯ দিনে অতিরিক্ত জাহাজের ভাড়া দৈনিক ১ লাখ ডলার হিসেবে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার মিলে সাকুল্যে ৫৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৩ ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা জানানো হয়। এ বিষয়ে কথা হলে জাহাজটির শিপিং এজেন্টের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হাবিবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘লোহিত সাগরে যুদ্ধাবস্থার কারণে হামলার ঝুঁকি থাকায় বিকল্প রুট হিসেবে কেপ অব গুড হোপ হয়ে বাংলাদেশে আসছে এমটি নিনেমিয়া। এজন্য জাহাজ ভাড়ার অতিরিক্ত খরচের বিষয়টি বিএসসিকে ইমেইলের মাধ্যমে জানানো হয়েছে।’
এ বিষয়ে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে কথা হয় বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেকের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে বাব আল মান্দেবসহ লোহিত সাগরে অয়েল ট্যাংকারগুলোর হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এজন্য সুয়েজ ক্যানেল ও কেপ অব গুড হোপ হয়ে আসছে এমটি নিনেমিয়া।’ স্বাভাবিক সময়ে ইয়ানবু থেকে ১৩ দিনে আসা যায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আরও ৩২ দিনের মতো সময় বেশি লাগতে পারে। এই অতিরিক্ত সময়ের জন্য বাংকারিং, সুয়েজ ক্যানেল চার্জসহ নিয়মমাফিক খরচগুলো জাহাজ মালিক দাবি করেছে।’

জাহাজ আসতে ৪৯ দিন লাগার কথা হলেও ৪৫ দিনে চলে আসবে। এতে জাহাজ মালিক যে খরচ চেয়েছেন তা নেগোশিয়েট (দরকষাকষি) হবে। এতে চার থেকে সাড়ে চার মিলিয়ন ডলারের মতো অতিরিক্ত খরচ লাগতে পারে।-বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মাঔেশ তিনি বলেন, ‘জাহাজ আসতে ৪৯ দিন লাগার কথা হলেও ৪৫ দিনে চলে আসবে। এতে জাহাজ মালিক যে খরচ চেয়েছেন তা নেগোশিয়েট (দরকষাকষি) হবে। এতে চার থেকে সাড়ে চার মিলিয়ন ডলারের মতো অতিরিক্ত খরচ লাগতে পারে।’ প্রাথমিকভাবে বিপিসি থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়ে জাহাজটি বিকল্প রুটে আনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আমাদের ক্রুড আমদানির শিডিউলগুলো নির্ধারিত। এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে সৌদি আরব থেকে বিকল্প পথে ক্রুড আনতে হচ্ছে। এতে ৩৪-৩৫ দিনের মতো বেশি সময় লাগবে। বেশি ব্যয় হলে ইআরএলের ক্রুড ব্যবস্থাপনাও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে।-বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ও বাণিজ্য) মো. জাহিদ হোসাইন এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ও বাণিজ্য) মো. জাহিদ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের ক্রুড আমদানির শিডিউলগুলো নির্ধারিত। এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে সৌদি আরব থেকে বিকল্প পথে ক্রুড আনতে হচ্ছে। এতে ৩৪-৩৫ দিনের মতো বেশি সময় লাগবে। বেশি ব্যয় হলে ইআরএলের ক্রুড ব্যবস্থাপনাও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে।’ অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিএসসি থেকে অতিরিক্ত খরচের বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ক্রুড আসা ও আনলোড হওয়ার পর জাহাজ মালিকপক্ষের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন মেনে নেগোশিয়েট করে অতিরিক্ত খরচের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।’ এমটি নিনেমিয়া জাহাজটি ২০২৪ সালে নির্মিত। এর আগে ৬ মে এবং ১৭ জুন ক্রুড নিয়ে বাংলাদেশে আসে জাহাজটি। মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজটির দৈর্ঘ্য ২৫০ মিটার, প্রস্থ ৪৪ মিটার। জাহাজটির ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৩৯ টন।

 

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ
ফেসবুক পেজ